অর্জন বনাম গর্জন: সরকারের শতদিনের খেরোখাতায় কমছে জনআস্থা
শতদিনে গর্জন বেশি, অর্জন কতটুকু?

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। এক বিশাল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঢেউয়ে ভর করে, দীর্ঘ সতেরো বছরের নির্বাসন ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসল বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। দীর্ঘদিনের ক্লান্তি, গুম-খুন এবং ভয়ের পরিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে দেশের মানুষ ভেবেছিল, এবার বুঝি চারপাশের চেনা জগতটা বদলাবে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসার পর তারেক রহমানও প্রথামতো ঘোষণা করলেন ‘১০০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি’।
কিন্তু আজ গুনে গুনে সেই শতদিন পার হওয়ার পর পেছনে তাকালে দেখা যায়, স্বপ্নের চেয়ে আশঙ্কার মেঘই যেন বেশি জমেছে। মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে—ক্ষমতার এই নতুন অলিন্দে আসলে কী বদলেছে? সরকার বড় বড় অনেক সিদ্ধান্তের কথা বলেছে, দাবি করেছে বিপুল অর্জনের। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। চারপাশের দৃশ্যপটে এখন অর্জনের চেয়ে গর্জনের শব্দই বেশি ভারী। মানুষের নিত্যদিনের নিরাপত্তা আর চড়া বাজারদরের আগুনে পুড়ে যাচ্ছে সেই শুরুর স্বস্তি।
শুরুটা হয়েছিল বেশ ধুমধাম করেই। সরকার গঠনের পর থেকেই বড় বড় বুলি আর চমক দেখানোর এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা শুরু হয়। রাজপথে দেখা যায় অলিম্পিক দৌড়বিদদের মতো কিছু অতিউৎসাহী কর্মী-সমর্থককে, যাদের প্রধান জাতীয় কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির আগে-পিছে অবিরাম ছুটে চলা। শতদিনের মাথায় এসে সরকারি মুখপাত্ররা পরিসংখ্যানের খাতা খুলে বসেন। বুক ফুলিয়ে দাবি করা হয় যে, মন্ত্রিসভার ১০টি বৈঠকে নেওয়া ৬০টি নীতিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৭টি সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকি ২৩টি সিদ্ধান্তও নাকি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্তগুলোর কতটুকু সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি এনেছে? কাগজের বাঘ আর গালভরা বুলি দিয়ে তো আর ক্ষুধার্ত মানুষের পেট ভরে না, রাজপথের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয় না। শুরুতেই সরকার যেভাবে তাড়াহুড়ো করে গণভোটের ধারণাকে অস্বীকার করল এবং সংবিধান সংস্কারের নামে নিজেদের সুবিধাজনক অংশগুলো বদলে ফেলে জনগণের মৌলিক চাহিদার বিষয়গুলোকে ঝুলিয়ে রাখল, তাতেই অনেকের চোখ কপালে উঠেছিল। ক্ষমতার চেয়ারে বসেই জনআকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটানোর এই চতুর প্রক্রিয়ায় প্রথম ফাটল ধরেছিল জনআস্থায়।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। মানুষ আশা করেছিল, একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার আসার পর অন্তত রাজপথে নির্ভয়ে হাঁটা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। গত একশ দিনের খেরোখাতায় চোখ বুলালে দেখা যায়, দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক ও নড়বড়ে রূপ নিয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন এবং পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান এক নির্মম সত্য তুলে ধরছে। এই ১০০ দিনে দেশে খুন হয়েছেন ৬০৫ জন মানুষ। এর মধ্যে মার্চ ও এপ্রিল মাসে অপরাধের হার বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ছিল। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১৯৬টি, আর চুরির সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২ হাজার ২১৪টি।
কিন্তু এর চেয়েও বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে আমাদের মা-বোন ও শিশুদের জীবনে। এই স্বল্প সময়েই নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন শতাধিক নারী, যার মধ্যে শিশু ধর্ষণের সংখ্যাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক। গত ১৯ মে ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে যেভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে, তা পুরো দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষ এখন ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন তুলছে—এটাই কি নতুন সরকারের সুশাসনের নমুনা?
আইনশৃঙ্খলার এই অবনতির পেছনে আরেকটি বড় কারণ প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং পুলিশের মনোবল সংকট। বিগত আমলের আমলানির্ভরতা ও দলদাসত্বের চড়া মূল্য দেখার পরও বর্তমান সরকার প্রশাসন ও পুলিশের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, মাঠপর্যায়ে শাসক দলের নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী মহলের চাপ, হুমকি ও প্রভাবের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। সম্প্রতি কালশীতে পুলিশের ওপর হামলার পর যেভাবে সদস্যদের দৌড়ে পালাতে দেখা গেছে, তা ছিল অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও লজ্জাজনক। পুলিশ এখনও নিজের পেশাদারিত্ব ও সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে পায়নি। অপরাধ ও অপরাধী দমনে শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবও স্পষ্ট, যখন দেখা যায় ক্ষমতাসীন দলের বহু অপরাধী আইনের তোয়াক্কা না করেই বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এর সঙ্গে মরণকামড় হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘মব কালচার’ বা গণপিটুনির আদিম উৎসব। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে যে মব ভায়োলেন্সের সূচনা হয়েছিল, রাজনৈতিক সরকার আসার পরও তার লাগাম টানা যায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুখে মুখে মব কালচারের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও মাঠের চিত্র ভিন্ন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম চার মাসেই ১৩২টি গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ৭১ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। মার্চ ও এপ্রিল মাসেই প্রাণ গেছে ৩৫ জনের। যখন-তখন, যেখানে-সেখানে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতি রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতা এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থাকেই নগ্নভাবে সামনে নিয়ে আসে।
রাজপথের এই অরাজকতার সমান্তরালে দেশের অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থায় চলছে আরেক উৎসব—চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের উৎসব। নির্বাচনের আগে যে চাঁদাবাজির জন্ম হয়েছিল, সরকার গঠনের পর তা যেন পূর্ণ যৌবন লাভ করেছে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া দখল-লুণ্ঠনের ঐতিহ্যের ওপর এখন জাঁকিয়ে বসেছে নতুন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। দেশের নদী-নালা, খাল-বিল, জমিজমা ও বাজারগুলো নতুন করে দখলের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। ভোগ্যপণ্য পরিবহনকারী ট্রাক থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত বেপরোয়া চাঁদাবাজির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, এই ১০০ দিনে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বেড়েছে ৮.৩৯ শতাংশ, বাড়িভাড়া বেড়েছে ৮.৯২ শতাংশ এবং যাতায়াত ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ৯.৩১ শতাংশ। দেশের গড় পয়েন্ট মুদ্রাস্ফীতি এখন প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য করতে না পেরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। ঢাকা থেকে মফস্বলের কাঁচাবাজার—সবখানেই সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। অথচ সরকারের নীতিনির্ধারকেরা অর্থনৈতিক সংস্কারের বড় বড় বুলি আওড়াচ্ছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে তড়িঘড়ি অপসারণ করে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে বসানোকে সরকার বড় সাফল্য মনে করতে পারে, কিন্তু ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা, খেলাপি ঋণের পাহাড় এবং আর্থিক খাত সংস্কারের কোনো সুস্পষ্ট পথনকশা এখনও জনগণের সামনে নেই। রাজস্ব আদায়ের হার গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। ফলে সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতাও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার চেয়ে সরকারের মনোযোগ গিয়ে ঠেকেছে কথিত ‘কার্ডের বিপ্লবে’। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড, ফুয়েল কার্ড, এলপিজি কার্ড, হকার কার্ড—নানান ধরনের কার্ড বিতরণের বন্যা বইয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ সাময়িকভাবে প্রচারের খোরাক জোগালেও এর পেছনে থাকা দলীয় প্রভাব, ভুয়া তালিকা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রোধে কোনো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা গড়ে তোলা হয়নি। ফলে এগুলো দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়নের পরিবর্তে পুরোনো পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির নতুন মোড়ক হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মন্ত্রীদের অতিকথন ও আচরণগত অসারতা। সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে কয়েকজন মন্ত্রীর অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যে বিরক্ত। অনেকে রসিকতা করে বলতে শুরু করেছেন, সরকার যেন বিনোদনের জন্য কয়েকজন ভাঁড়মন্ত্রী উপহার দিয়েছে। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বাদে যেন দুনিয়ার সব বিষয়েই কথা বলে বেড়াচ্ছেন। দেশের ভঙ্গুর বিচার ব্যবস্থা ও আইনের শাসন নিয়ে আইনমন্ত্রীরও দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। এই ধরনের অসারতা ও উদাসীনতা সরকারের প্রতি জনআস্থায় বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি করছে।
নিত্যপণ্যের আগুন আর চাঁদাবাজির এই উত্তাল সময়ে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা হয়ে এসেছে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাব। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের সমন্বয়হীনতা ও অদূরদর্শিতা দেশের স্বাস্থ্য খাতের কঙ্কালসার চেহারাকে আবারও উন্মোচন করেছে। বিগত সরকারের টিকার ঘাটতি কিংবা রুটিন ইমিউনাইজেশনের দুর্বলতার অজুহাত দিয়ে বর্তমান সরকার দায় এড়াতে চাইছে। কিন্তু সংকট যখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন তাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত শ্লথ। সরকারি হিসেবেই এই ১০০ দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে ৫৮৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একটি স্বাধীন দেশে চিকিৎসার অভাব এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটিতে প্রতিদিন এভাবে শিশুদের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নৈতিক পরাজয়গুলোর একটি। সরকার জরুরি ভিত্তিতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার দাবি করলেও ততক্ষণে শত শত মায়ের কোল খালি হয়ে গেছে। জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখে প্রশাসনের এই নীরবতা ও দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষকে গভীর অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ক্ষমতার প্রথম ১০০ দিন কাটতে না কাটতেই দেশে বিরোধী মত দমনের একটি চেনা প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। যারা সরকারের ভুলত্রুটি নিয়ে কথা বলছেন, তাদেরই টার্গেট করা হচ্ছে। বাকস্বাধীনতার সুরক্ষার বড় বড় অঙ্গীকারের আড়ালে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। সরকারের মেয়াদের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বেশ কয়েকটি সংবাদভিত্তিক পোর্টাল চাপের মুখে কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। অনেককে ব্যক্তিগতভাবেও ‘সতর্ক’ করা হচ্ছে।
টিআইবি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, সিটি করপোরেশন এবং ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় লোকজনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকার নিজস্ব নির্বাচনী ইশতেহার এবং রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব নিয়োগ না দিয়ে সেগুলোকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গুম প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনগত সংস্কারগুলোও কার্যকর অগ্রগতি পায়নি। সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে এগুলো বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন স্তরে এখন ‘এবার আমাদের পালা’ নামের এক ভয়াবহ মানসিকতা দৃশ্যমান। পুলিশ, প্রশাসন, ব্যাংক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেদারসে চলছে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও বদলির খেলা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর কিছু সাম্প্রদায়িক হামলা, যা দেশের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের গায়ে কুঠারাঘাত করছে।
দেশের খেটে খাওয়া মানুষ সরকারের কাছে কোনো চমক চায়নি। তারা চেয়েছিল শান্তিতে দুমুঠো ডাল-ভাত খেয়ে রাতে নিরাপদে ঘুমাতে। কিন্তু ক্ষমতার শতদিনের মাথায় এসে সেই নিরাপত্তাবোধই আজ উধাও। বড় বড় প্রকল্পের গর্জন আর মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের চটকদার পরিসংখ্যান মফস্বলের মানুষের কাছে নির্মম পরিহাসের মতো শোনায়।
অতীতের কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসকই গুম, খুন এবং ভয় দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত পার পায়নি। ইতিহাসের এই নির্মম সত্যটি বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্যও বড় শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১০০ দিনের মাথায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সরকার এখনও সাদা-কালোর এক ধূসর গোলকধাঁধায় আটকে আছে। ক্ষমতার সীমা টেনে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার চেয়ে তারা ক্ষমতার জোরালো ব্যবহারে বেশি আগ্রহী। এই পথ যে কতখানি পিচ্ছিল, তা হয়তো সরকার এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করছে না। তবে যদি দ্রুত নীতি, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে চাঁদাবাজি, মব কালচার এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে জনআস্থার এই ক্ষীয়মাণ পুঁজিটুকু শেষ হতে বেশি সময় লাগবে না। তখন হয়তো শুধুই গর্জনের খেরোখাতা পড়ে থাকবে, অর্জনের ঝুলি থাকবে শূন্য।









