তোফায়েল আহমেদ: ইতিহাসের আয়নায় এক বিতর্কিত অধ্যায়

আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদের জীবনাবসান ঘটেছে ঢাকার একটি হাসপাতালে। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগে অবশেষে তিনি বিদায় নিলেন। তার মৃত্যুর পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সংবাদমাধ্যমে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের নানা আখ্যান শোনানো হচ্ছে। ১৯৪৩ সালের অক্টোবরে ভোলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসে দেশের অন্যতম নীতিপ্রণেতা হয়েছিলেন। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করার কারিগর হিসেবে ইতিহাসের পাতায় তার নাম জুড়ে আছে। কিন্তু মৃত্যুর পর দেশের একদল তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এবং চাটুকার গোষ্ঠী তার জীবনের কেবল উজ্জ্বল দিকগুলোই সামনে আনার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।
ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকার গত দেড় দশকে বাংলাদেশের মানুষের ওপর যে নির্মম নির্যাতন ও দমনপীড়ন চালিয়েছে, শুরু থেকেই তোফায়েল আহমেদ তার অন্যতম সক্রিয় অংশীদার ও সমর্থক ছিলেন। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে তিনি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও কান্নার পাশে দাঁড়াননি। অথচ আজ তার মৃত্যুর পর সেই সব অত্যাচার, নিপীড়ন এবং তার জীবনের দীর্ঘ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডগুলো সযতনে ভুলে যাওয়ার এক চতুর ভান করা হচ্ছে। তোফায়েল আহমেদ কেবল একজন বর্ণাঢ্য রাজনীতিক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। তার জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা এই ক্ষমতার অপব্যবহার ও ফ্যাসিবাদের নীরব কিংবা সরব সমর্থন তাকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় সবসময় সমালোচনার পাত্র করে রাখবে।
তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা যদি তলিয়ে দেখা যায়, তবে দেখা যাবে ছাত্ররাজনীতির সোনালী দিনগুলোতেও তিনি একচ্ছত্র আধিপত্য ও অসহিষ্ণুতার বীজ বপন করেছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় তোফায়েল আহমেদ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম প্রধান নেতা এবং ডাকসুর ভিপি ছিলেন। সেই সময় আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ ছাত্রদের আবেগ ও অংশগ্রহণ ছিল অভূতপূর্ব। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই আন্দোলন পরিচালনার সময় তোফায়েল আহমেদ অন্য ডানপন্থী ও বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর ত্যাগী নেতাদের মতামতের কোনো তোয়াক্কা করেননি। তৎকালীন ছাত্রলীগের নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডাকে তিনি এককভাবে পুরো ছাত্রসমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আন্দোলনের মঞ্চে অন্যান্য প্রগতিশীল ও লড়াকু ছাত্রনেতাদের অবমূল্যায়ন করার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ক্ষমতার এই এককেন্দ্রীকরণ ও ভিন্নমতের প্রতি চরম অবজ্ঞা তার ছাত্রজীবনের নেতৃত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
এই অসহিষ্ণুতা কেবল মতামতের বিরোধিতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা রূপ নিয়েছিল সশরীরে দমনপীড়নে। ১৯৬৯ সালের শেষভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর আশেপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, বিশেষ করে মেনন ও মতিয়া গ্রুপ এবং অন্যান্য ডানপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে ছাত্রলীগের আদর্শিক সংঘাত চরম আকার ধারণ করে। সেই উত্তাল সময়ে তোফায়েল আহমেদের প্রচ্ছন্ন ও প্রত্যক্ষ মদদে সমাজতান্ত্রিক এবং ভিন্ন মতাদর্শের ছাত্রনেতা ও কর্মীদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালানো হয়। ক্যাম্পাস থেকে ভিন্নমতের ছাত্রদের জোরপূর্বক বিতাড়িত করার পেছনে তার অনুসারীদের ভূমিকা ছিল প্রকাশ্য। ছাত্র রাজনীতিতে পেশীশক্তির ব্যবহার এবং ভিন্নমতকে পিষে মারার যে সংস্কৃতি আজ বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলোকে ধ্বংস করেছে, তার পেছনে এই আওয়ামী নেতার অতীত ভূমিকা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে ১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসের আবদুল মালেক হত্যাকাণ্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ইসলামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আব্দুল মালেকের ওপর বামপন্থী ও সেক্যুলার ছাত্রনেতাদের এক ভয়াবহ ও নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে। লোহার রড আর লাঠির আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মালেকের মৃত্যু হয়। তৎকালীন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভিপি এবং সামগ্রিক ছাত্র আন্দোলনের মূল নিয়ন্ত্রক বা ডিক্টেটর হিসেবে তোফায়েল আহমেদ এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর অভিযোগ, তিনি কেবল এই বর্বর হামলা ঠেকাতেই উদাসীন ছিলেন না, বরং প্রকারান্তরে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে হামলাকারী ও খুনিদের আইনগত ব্যবস্থা থেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। একজন ছাত্রনেতা হিসেবে সাধারণ ছাত্রের নিরাপত্তা দিতে না পারার এই ব্যর্থতা ও খুনিদের আশ্রয় দেওয়ার কলঙ্ক তার ক্যারিয়ারের বড় একটি কালো দাগ।
স্বাধীনতার ঠিক পূর্বমুহূর্তে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে যে চরমপন্থী ও তরুণদের নিয়ে গোপন সশস্ত্র গোষ্ঠী বা 'নিউক্লিয়াস' সক্রিয় ছিল, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তার অন্যতম প্রধান সদস্য। শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাকদের সঙ্গে মিলে তারা এক সমান্তরাল শক্তি বলয় তৈরি করেছিলেন। এই গোষ্ঠীটি মূল আওয়ামী লীগের প্রবীণ, অভিজ্ঞ ও গণতান্ত্রিক ধারার নেতাদের সবসময় সন্দেহের চোখে দেখত। বিশেষ করে তাজউদ্দীন আহমদের মতো প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতার যৌক্তিক মতামতকে তারা প্রতিনিয়ত উপেক্ষা করতেন। এই উগ্রপন্থী ও একরোখা মানসিকতা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে এবং যুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী সরকারের ভেতর এক বিশাল ও বিপজ্জনক বিভাজন তৈরি করেছিল।
এর ফলেই পরবর্তীতে মূল মুক্তিবাহিনীর সমান্তরালে 'মুজিব বাহিনী'র মতো একটি বিতর্কিত ও নিজস্ব কমান্ডের সশস্ত্র বাহিনী গঠিত হয়। এই সমান্তরাল বাহিনী গঠনের ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল, তার দায় তোফায়েল আহমেদ কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনের আগেও দলীয় মনোনয়ন বণ্টন এবং মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব নির্ধারণে তোফায়েল আহমেদ তাঁর নিজস্ব বলয় ও অনুসারীদের অন্ধভাবে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এর ফলে বহু ত্যাগী, প্রবীণ ও প্রগতিশীল নেতাকে কোণঠাসা করে ফেলা হয়। দল ও ছাত্ররাজনীতিতে নিজের একচ্ছত্র একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার এই নোংরা খেলা তিনি শুরু থেকেই খেলে এসেছেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তোফায়েল আহমেদকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তাঁর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিযুক্ত করেন। আর এই পদের আড়ালেই শুরু হয় ক্ষমতার আরেক অন্ধকার অধ্যায়। স্বাধীনতার পর পরই দেশে ভিন্নমত দমন ও বিরোধীদের শায়েস্তা করার জন্য তৎকালীন সরকার 'রক্ষী বাহিনী' নামে একটি কুখ্যাত ও আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে। আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে এই রক্ষী বাহিনী দেশের সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ওপর নির্বিচারে হত্যা, গুম ও নির্যাতন চালিয়েছিল।
তৎকালীন একাধিক প্রবীণ রাজনীতিক ও ইতিহাসের সাক্ষী ও গবেষকদের মতে, শেখ মুজিবের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে তোফায়েল আহমেদের হাতেই আনঅফিসিয়ালি বা অলিখিতভাবে সেই রক্ষী বাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ন্যস্ত ছিল। রক্ষী বাহিনীর প্রতিটি বর্বর অভিযানের পেছনে তাঁর ইশারা ও পরিকল্পনা কাজ করত। দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের এই প্রাথমিক রূপায়ণে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা তাকে আজীবন এক নির্মম রাজনীতিক হিসেবে চিহ্নিত করে রাখবে।
এরপর ১৯৭৪ সালে যখন স্বাধীন বাংলাদেশে এক ভয়াবহ ও কালান্তক দুর্ভিক্ষ নেমে আসে, তখন তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। সেই ক্ষুধার্ত সময়ে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ অন্নহীন অবস্থায় রাস্তায় মরে পড়ে থাকত, তখন সরকারি গুদামে চাল মজুত থাকা সত্ত্বেও তা সাধারণ মানুষের মাঝে বণ্টন করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, তোফায়েল আহমেদের সরাসরি নির্দেশে বা প্রভাবে সরকারি খাদ্য গুদামে তালা মেরে বিপুল খাদ্যশস্য আটকে রাখা হয়েছিল। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং কালোবাজারিদের সুবিধা করে দিতে কৃত্রিম এই সংকটের তীব্রতা বাড়ানো হয়েছিল, যা দুর্ভিক্ষকে আরও বেশি প্রলয়ঙ্করী করে তোলে। মানুষের পেটের ক্ষুধা নিয়ে এমন নির্মম রাজনীতি কেবল তোফায়েল আহমেদের পক্ষেই সম্ভব ছিল।
পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে যখন গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়ে একক দল হিসেবে 'বাকসাল' গঠিত হয়, তখন তিনি আনন্দের সঙ্গে এর যুব শাখা ‘জাতীয় যুবলীগ’-এর সাধারণ সম্পাদকের পদ লুফে নেন এবং একদলীয় স্বৈরাচারী শাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে মরিয়া হয়ে কাজ করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত রহস্যজনক এবং কাপুরুষোচিত। রক্ষী বাহিনীর মতো একটি বিশাল বাহিনী যার হাতের ইশারায় চলত, সেই মানুষটি বিপদের দিনে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও নীরব হয়ে রইলেন। নিজের রাজনৈতিক অভিভাবকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও তিনি কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেননি বা রাজপথে নামেননি। তার এই রহস্যময় নীরবতা ও তথাকথিত 'নিষ্ক্রিয়তার' জন্য পরবর্তীতে খোদ শেখ হাসিনা এবং দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা তাঁর ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন। যদিও পরবর্তীতে তিনি গ্রেপ্তার হয়ে ৩৩ মাস কারাবাস ভোগ করেন, কিন্তু দলের প্রতি তাঁর এই চরম গাফিলতি ও সুযোগসন্ধানী চরিত্র দলের ভেতরেই তাঁকে আজীবন সন্দেহের চোখে দেখার সুযোগ করে দেয়।
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তোফায়েল আহমেদ শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। সেই মেয়াদে তাঁর অধীনে ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহার ও দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ মেয়াদের সেই সরকারের সময় তোফায়েল আহমেদের ব্যক্তিগত সহকারী বা এপিএসের ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষ ও সরকারি কর্মকর্তারা তটস্থ থাকতেন। ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের উদ্দেশ্যে পুলিশকে ব্যবহার করে তার এপিএসের প্রত্যক্ষ নির্দেশে থানায় ও পুলিশ হেফাজতে সাধারণ মানুষের ওপর নির্মম ও অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো। ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে তোফায়েল আহমেদ তাঁর অধীনস্থদের এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো স্রেফ উপভোগ করেছেন এবং তাদের অভয় দিয়ে গেছেন।
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ডিগবাজি ও সুযোগসন্ধানী চরিত্র উন্মোচিত হয় ২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন মাইনাস-টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছিল, তখন তোফায়েল আহমেদ রাজপথে তার নিজের দলের নেত্রীর পক্ষে দাঁড়ানোর বদলে উল্টো পিঠে ছুরি মারেন। তিনি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া 'সংস্কারপন্থী' নামক কুখ্যাত দলটির অন্যতম শীর্ষ নেতা ও রূপকার হিসেবে আবির্ভূত হন।
দলের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে দলকে কুক্ষিগত করার সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি খোদ শেখ হাসিনার তীব্র বিরাগভাজন হন। এক পর্যায়ে তিনি দলে চরমভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং নিজের বিশ্বস্ততা হারিয়ে বসেন। ক্ষমতার লোভে নিজের আজীবনের আদর্শ ও নেত্রীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার এই ঘটনাটি তাঁর রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকেই প্রমাণ করে।
১/১১-এর সেই পাপের খেসারত তাঁকে দিতে হয়েছে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও তোফায়েল আহমেদকে তাঁর অতীত বিশ্বাসঘাতকতার কারণে মন্ত্রিপরিষদ থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। নীতি নির্ধারণী প্রেসিডিয়াম থেকে বাদ দিয়ে তাকে নামমাত্র ও ক্ষমতাহীন উপদেষ্টা পরিষদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দলের ভেতর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল সাধারণ সম্পাদক হওয়ার, কিন্তু নেত্রীর আস্থাহীনতার কারণে বারবার তাঁকে উপেক্ষা করা হয়। এই অবহেলা ও কোণঠাসা অবস্থা তাঁর মাঝে এক গভীর ও তীব্র হতাশার জন্ম দিয়েছিল। তিনি নিজের ঘনিষ্ঠজনদের কাছে প্রায়ই বলতেন যে তিনি দলে চরমভাবে অবহেলিত ও কোণঠাসা হয়ে আছেন। ক্ষমতার কাঙাল এই মানুষটি জীবনের শেষভাগে এসে বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাজনীতির মাঠে বিশ্বাসঘাতকদের শেষ পরিণতি কতটা করুণ হয়।
তবে ক্ষমতার লোভ তোফায়েল আহমেদকে এতটাই অন্ধ করে রেখেছিল যে, বারবার অপমানিত হওয়ার পরও তিনি ফ্যাসিবাদের পথ ছাড়েননি। ২০১৩ সালের নির্বাচনকালীন সময়ে এবং পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন ও লোকদেখানো একতরফা নির্বাচনে তিনি পুনরায় বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৫৩ জন সংসদ সদস্য কোনো ভোট ছাড়াই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার যে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয়েছিল, সেই একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচন ব্যবস্থা এবং এর ফলাফলকে জায়েজ করার পেছনে তোফায়েল আহমেদের অন্যতম প্রধান ও কুৎসিত ভূমিকা ছিল। তিনি অবলীলায় জনগণের ভোটাধিকার হরণের এই উৎসবকে সমর্থন জুগিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের সম্পূর্ণ বর্জিত ও প্রহসনের জাতীয় নির্বাচনেও তিনি ভোলা-১ আসন থেকে পুনরায় তথাকথিত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে গঠিত প্রতিটি ফ্যাসিবাদী সরকারের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দেশের ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যখন ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে, তখন তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়। পতনের পর সংসদ ভেঙে দেওয়া হলে তার অবৈধ মেয়াদের অবসান ঘটে। এরপর তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিপুল দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং বিগত সরকারের দমনপীড়নের সহযোগী হিসেবে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয় এবং সরকারিভাবে তার দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি কার্যত গৃহবন্দী এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় চরম গ্লানি নিয়ে কাটান।
তোফায়েল আহমেদ আর নেই। তিনি এমন এক সময়ে চিরবিদায় নিলেন যখন তার নিজের দল আওয়ামী লীগ গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে চরমতম সংকটের মুখোমুখি এবং তাদের সমস্ত ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে ঘৃণিত। তোফায়েল আহমেদের পুরো রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি কেবলই ক্ষমতার পুতুল হিসেবে কাজ করেছেন। ছাত্রজীবনের একচ্ছত্র আধিপত্যের চেষ্টা, স্বাধীনতার পর রক্ষী বাহিনীর অলিখিত নিয়ন্ত্রণ, ৭৪-এর দুর্ভিক্ষের সময় অনৈতিক মজুতদারী, ৭৫-এর ট্র্যাজেডির পর রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা, ৯৬-এর সরকারের সময়কার নির্যাতন এবং সর্বশেষ বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী সরকারের একনিষ্ঠ দোসর - এই সব কিছুই প্রমাণ করে তিনি দেশের মানুষের কল্যাণের চেয়ে নিজের ক্ষমতার আসনকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা আজ যতই তাঁর রাজনৈতিক কীর্তির গুণগান গেয়ে তাঁর অতীত অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করুন না কেন, বাংলার শোষিত ও নির্যাতিত মানুষের স্মৃতি থেকে তাঁর আমলের অত্যাচার ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডগুলো মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ইতিহাসের পাতা তার এই বর্ণাঢ্য অথচ চরম বিতর্কিত ও কলঙ্কিত অধ্যায়গুলোকে সবসময় সজাগ রাখবে এবং তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন সুবিধাবাদী ও বিতর্কিত রাজনীতিবিদ হিসেবেই চিরকাল সমালোচিত হবেন।









