মাঠ নেই, মোবাইলই এখন শিশুদের 'পৃথিবী'

রাজধানী ঢাকার আকাশরেখা প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে। পুরনো খোলা জমি, পুকুর, খেলার মাঠ, জলাশয় ও ফাঁকা জায়গার জায়গা দখল করছে একের পর এক বহুতল ভবন, আবাসন প্রকল্প, শপিং কমপ্লেক্স এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা। দ্রুত নগরায়নের এই প্রবল চাপে সবচেয়ে নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে শিশু-কিশোরদের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো—খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত সবুজ স্থান।
একসময় ঢাকার মহল্লাভিত্তিক মাঠগুলো ছিল শিশুদের বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক জায়গা। বিকেলের ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ছিল শহুরে শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন সেই জায়গা দখল করেছে কংক্রিট, যানজট, পার্কিং আর মোবাইল স্ক্রিন। বিশেষ করে রাজধানীর দ্রুত সম্প্রসারিত আবাসিক অঞ্চল বাড্ডা, বনশ্রী, রামপুরা, আফতাবনগর, ভাটারা ও সাতারকুলে এই সংকট সবচেয়ে তীব্র হয়ে উঠেছে। হাজার হাজার নতুন পরিবার এসব এলাকায় বসবাস শুরু করলেও সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি মাঠ, পার্ক কিংবা উন্মুক্ত গণপরিসর। ফলে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে একটি ‘মাঠহীন প্রজন্ম’।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ৫৪টি ওয়ার্ডে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১০৬টি পার্ক, খেলার মাঠ, ওয়াকওয়ে ও উন্মুক্ত গণপরিসর রয়েছে। সংখ্যাটি শুনতে বড় মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ১০৬টি স্থানের মধ্যে মাত্র ৩১টি সরাসরি ডিএনসিসির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাকিগুলো রাজউক, গণপূর্ত বিভাগ, বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ২৬টি মাঠ ও পার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় থাকলেও অন্তত ১০টি ওয়ার্ডে এখনো কার্যকর কোনো মাঠ বা পার্ক নেই।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বর্তমান জনসংখ্যার অনুপাতে শুধু ঢাকা উত্তরে অন্তত আরও ৬১০টি খেলার মাঠ প্রয়োজন। অর্থাৎ বর্তমান অবকাঠামো চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করছে। তাদের মতে, একটি বাসযোগ্য শহরে মোট ভূমির অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উন্মুক্ত সবুজ এলাকা থাকা উচিত হলেও ঢাকার অনেক এলাকায় সেটি ৫ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে।
পরিকল্পিত আবাসন বনশ্রীতেও মাঠহীনতা
বনশ্রীকে রাজধানীর অন্যতম পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রশস্ত সড়ক, ব্লকভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক জোন—সবই আছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পরিকল্পনার বড় ঘাটতি হলো শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান না থাকা। বাসিন্দাদের দাবি, শুরুতে যেসব জায়গা ‘গ্রিন জোন’ কিংবা উন্মুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারিত ছিল, সময়ের সঙ্গে সেগুলোর বড় অংশ ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় রূপ নিয়েছে। বর্তমানে আজিজ পার্ক এলাকাটির অন্যতম পরিচিত উন্মুক্ত স্থান হলেও সেটি পুরো বনশ্রীর বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
বনশ্রীর ডি-ব্লকের বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের ৯ বছর বয়সী ছেলে সাদাফ আল জারিফ। পড়াশোনার বাইরে তার বিনোদনের বড় অংশ এখন টেলিভিশন ও মোবাইল স্ক্রিনেই সীমাবদ্ধ। আশপাশে নিরাপদ কোনো খেলার মাঠ না থাকায় ছেলেকে বাইরে খেলতে পাঠাতে পারেন না বলে জানান তিনি। রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের শৈশব কেটেছে মাঠে খেলাধুলা করে, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে নানা আনন্দ আয়োজনের মধ্যে। কিন্তু আমার ছেলের শৈশবের কথা ভাবলে খুব কষ্ট হয়। আশপাশে হাঁটার জায়গা নেই, খেলার মাঠ নেই। স্কুল আর পড়াশোনার বাইরে সে কী করবে?”
তিনি আরও বলেন, “বাধ্য হয়ে সুযোগ পেলেই তাকে দূরে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাই। কিন্তু সেটা তো সবসময় সম্ভব না। আমরা নিয়মিত ভ্যাট-ট্যাক্স দিচ্ছি, তাহলে রাষ্ট্র বা সিটি কর্পোরেশন আমাদের সন্তানদের জন্য কী করছে?”
একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেন বনশ্রীর ই-ব্লকের বাসিন্দা ফারহানা হক। তিনি বলেন, “আমার সাত বছরের ছেলে ফুটবল খেলতে খুব পছন্দ করে। কিন্তু তাকে কোথায় খেলতে দেব? নিচে নামলেই চারদিকে গাড়ি আর সরু রাস্তা। বাধ্য হয়ে মোবাইল বা ট্যাব দিয়েই ব্যস্ত রাখতে হয়।” তিনি বলেন, “আমরা ছোটবেলায় বিকেল মানেই মাঠ বুঝতাম। এখনকার বাচ্চারা বিকেল মানেই ইউটিউব বোঝে।”
স্থানীয় দোকানদার মোহাম্মদ ইমরান বলেন, বিকেলে প্রায়ই শিশুদের অলিগলিতে ক্রিকেট খেলতে দেখা যায়। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। অনেক সময় গাড়ির কাচ ভাঙা কিংবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঝগড়ার ঘটনাও ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পিত আবাসনের পরিচয়ের আড়ালে বনশ্রীতে শিশুদের জন্য নিরাপদ উন্মুক্ত জায়গার সংকট দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
একই অবস্থা আফতাবনগরেও
প্রশস্ত সড়ক, লেক, আধুনিক আবাসন এবং তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে আফতাবনগরকে রাজধানীর অন্যতম পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাহ্যিক সৌন্দর্যের আড়ালে শিশু-কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গার সংকট এখানে দিন দিন প্রকট হচ্ছে।
এলাকার বড় উন্মুক্ত স্থান হিসেবে পরিচিত আফতাবনগর লেক এবং ২ নম্বর ব্লকের মাঠ। সকাল-বিকেলে লেকপাড়ে হাঁটতে মানুষের ভিড় থাকলেও সেটি শিশুদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে ২ নম্বর ব্লকের মাঠটি কার্যত পুরো এলাকার শিশু-কিশোরদের একমাত্র বড় ভরসা হলেও সেটি বছরের বড় সময়ই বিভিন্ন বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান, মেলা, পশুর হাট কিংবা অস্থায়ী প্যান্ডেলের দখলে থাকে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
আফতাবনগরের ডি-ব্লকের বাসিন্দা শাহিন আকন্দ বলেন, “আমার ছেলে-মেয়েদের কাছে খেলাধুলা মানেই এখন মোবাইল গেম। স্কুল-কলেজ শেষ করে বাসায় ফিরে তারা যে যার মতো বিছানায় শুয়ে বা সোফায় বসে ফোন নিয়েই ব্যস্ত হয়ে যায়। বাইরে গিয়ে খেলবে—সেই সুযোগটাই তো নেই।”
তিনি বলেন, “এখানকার রাস্তাগুলো তুলনামূলক বড় এবং খোলামেলা মনে হলেও বাস্তবে শিশুদের জন্য নিরাপদ কোনো মাঠ বা পার্ক নেই। রাস্তায় খেলতে দিলে সারাক্ষণ ভয় কাজ করে—হঠাৎ গাড়ি আসবে, মোটরসাইকেল আসবে কিংবা কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে।” শাহিন আকন্দের ভাষায়, এই সংকট শুধু খেলাধুলার অভাব নয়, বরং শিশুদের স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, “আমরা ছোটবেলায় মাঠে গিয়ে বন্ধু বানিয়েছি, দল বেঁধে খেলেছি, হার-জিত শিখেছি। এখনকার বাচ্চারা চার দেয়ালের মধ্যে বড় হচ্ছে। তারা বাস্তব বন্ধুদের চেয়ে ভার্চুয়াল গেমের বন্ধুদের বেশি চেনে।”
আফতাবনগরের আরেক বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, “ছুটির দিন এলে বাচ্চারা বাইরে কোথাও যেতে চায়। তখন বাধ্য হয়ে শপিং মল, রেস্টুরেন্ট কিংবা দূরের কোনো পার্কে নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটা নিয়মিত করা সম্ভব নয়।” তার ভাষায়, “শহরে শুধু আবাসিক ভবন বানালেই পরিকল্পিত নগর হয় না। শিশুদের জন্য মাঠ, পার্ক, হাঁটার জায়গা—এসবও মৌলিক প্রয়োজন। এগুলো ছাড়া ভবিষ্যতে আমরা অসুস্থ ও বিচ্ছিন্ন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার তকমা থাকলেও আফতাবনগরে শিশুদের জন্য টেকসই বিনোদন ও খেলাধুলার অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি।
ঘনবসতির চাপে অবহেলিত জনপদ বাড্ডা-রামপুরা
রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এবং দ্রুত সম্প্রসারিত এলাকাগুলোর একটি বাড্ডা ও রামপুরা। একদিকে আবাসিক ভবনের বিস্ফোরণ, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক স্থাপনা—এই দুইয়ের চাপে এলাকাটি এখন প্রায় পরিকল্পনাহীন নগর কাঠামোর বাস্তব উদাহরণে পরিণত হয়েছে।
মেরুল বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, উত্তর ও দক্ষিণ বাড্ডা, রামপুরার বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে হাজার হাজার পরিবার বসবাস করলেও শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার জায়গা সীমিত। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকায় একটি খেলার মাঠ রয়েছে, যা স্থানীয় শিশুদের জন্য আংশিক স্বস্তির জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি মাত্র মাঠ পুরো এলাকার চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। জনসংখ্যার তুলনায় এটি খুবই সীমিত সুযোগ, ফলে অধিকাংশ শিশু এখনো রাস্তা, গলি কিংবা ছোট খোলা জায়গাতেই খেলাধুলা করতে বাধ্য হচ্ছে। বাড্ডার প্রবীণ বাসিন্দা হাজী মেজবাহ উদ্দিন বলেন, “আগে এখানে অনেক খোলা জায়গা ছিল। ছেলেপেলেরা খেলত, ঘুড়ি ওড়াত, বিকেল মানেই ছিল মাঠ। এখন চারদিকে শুধু ভবন। সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্স তো ঠিকই নেয়, কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ রাখতে পারেনি।”
তিনি আরও বলেন, “ডিআইটি প্রজেক্টে একটা মাঠ আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা পুরো বাড্ডা-রামপুরার জন্য যথেষ্ট নয়। এই মাঠ সকাল-সন্ধ্যা বড়দের খেলা-ধুলায় এতো পরিমাণ ব্যস্ত থাকে যে, এখানে বাচ্চাদের খেলার কোন সুযোহই নেই। বাধ্য হয়ে তাদেরকে অলি-গলির রাস্তায় খেলতে হয়, এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।”
রামপুরার বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, “আমার ছেলে বাসার নিচে খেলতে যেতে চায়। কিন্তু নিচে নামলেই গাড়ি, মোটরসাইকেল, রিকশার ভিড়। তাই বাধ্য হয়ে ও বাসায় বসে মোবাইলে গেম খেলে।”
স্থানীয়দের মতে, ডিআইটি প্রজেক্টের মাঠটি থাকলেও সেটি মূলত একটি ব্যতিক্রম মাত্র। পুরো বাড্ডা-রামপুরা এলাকার তুলনায় এটি একেবারেই অপ্রতুল, ফলে এলাকাটি এখনো ‘মাঠ সংকট’ থেকে বের হতে পারেনি।
একমাত্র ভরসা হাতিরঝিল
বর্তমানে বাড্ডা, রামপুরা ও বনশ্রী এলাকার বহু পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে হাতিরঝিল। প্রতিদিন বিকেল নামলেই এই বিস্তীর্ণ জলাশয় ও ওয়াকওয়ে এলাকাটি পরিণত হয় আশপাশের জনপদের মানুষের প্রধান বিনোদনকেন্দ্রে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষ—সবাই এখানে সময় কাটাতে ছুটে আসেন।
প্রতিদিন বিকেল ও ছুটির দিনে হাতিরঝিলে মানুষের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পরিবার নিয়ে হাঁটতে আসা, শিশুদের নিয়ে ঘুরতে আসা কিংবা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময় কাটানো—সবকিছুই এখন অনেকাংশে এই একটি জায়গার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জায়গাটি প্রায়ই অতিরিক্ত ভিড় ও চাপের মুখে থাকে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, লাখো মানুষের জন্য একটি উন্মুক্ত স্থান কখনোই যথেষ্ট হতে পারে না।
স্থানীয়দের মতে, বাড্ডা-রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় খেলার মাঠ ও পার্কের ভয়াবহ সংকটের কারণে হাতিরঝিলই একমাত্র বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এটি কোনোভাবেই একটি বিশাল জনসংখ্যার নিয়মিত চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা তানজিয়া শারমিন ইভা বলেন, “আমাদের এলাকায় কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। বাচ্চারা খেলতে চায়, আমরা হাঁটতে চাই, সবকিছুর জন্যই একমাত্র জায়গা হাতিরঝিল। তাই সপ্তাহান্তে এখানে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।”
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি শহরের জীবনের ভারসাম্য শুধু একটি কেন্দ্রীয় উন্মুক্ত স্থানের ওপর নির্ভর করতে পারে না। তাদের ভাষায়, “হাতিরঝিল সুন্দর একটি পাবলিক স্পেস, কিন্তু এটি কখনোই বাড্ডা-রামপুরা-বনশ্রীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বিকল্প হতে পারে না।” তারা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নগরজুড়ে একটি অস্বাভাবিক নির্ভরতা তৈরি হবে, যেখানে কয়েক লাখ মানুষের বিনোদন ও অবসর কাটানোর জায়গা মাত্র একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।
মাঠ সংকটে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, গবেষণার ভয়ংকর তথ্য
বাংলাদেশের শহুরে শিশুদের জীবন এখন ইনডোর গেম আর স্মার্টফোনের ক্ষুদ্র পর্দায় সীমাবদ্ধ। সাম্প্রতিক একাধিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সতর্ক করছে যে, খেলার মাঠের অভাব এবং মোবাইল আসক্তি বাংলাদেশের শিশুদের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি দল বাংলাদেশের প্রাক-স্কুলগামী (৩-৫ বছর বয়সী) শিশুদের ওপর দীর্ঘমেয়াদী এক গবেষণা পরিচালনা করে, যা ২০২৩ সালে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি প্রকাশিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রাক-স্কুল শিশু প্রতিদিন অন্তত ১ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করে। এর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি শহর অঞ্চলে। গবেষণা বলছে, শহুরে শিশুদের বড় অংশই দিনে গড়ে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটায়, যাদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ শিশুর আসক্তি ‘মারাত্মক সমস্যা’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমনকি এসবের প্রধান কারণ হিসেবে ৯২ শতাংশ অভিভাবক ‘বাইরে খেলার জায়গার অভাব’কে দায়ী করেছেন।
শিশুদের এসব আসক্তির পেছনে পিতামাতার প্রভাবও রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। তাদের মতে, যেসব অভিভাবক দিনে ৩ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় মোবাইল ব্যবহার করেন, তাদের শিশুদের আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্য শিশুদের চেয়ে ৯০ গুণ বেশি। আর অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিশুদের মানসিক সমস্যার ঝুঁকি ৬.০৩ গুণ এবং শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি ৩.২৯ গুণ বেড়ে যায়।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) ২০২৫ সালের একটি সমীক্ষাতেও শিশুদের ডিজিটাল খাঁচায় বন্দি হওয়ায় ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রমাণ মিলেছে। ‘ডিজিটাল সার্ভিসেস এক্সেস সার্ভে’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও সামাজিক পরিবেশের অভাবে বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী তীব্র বিষণ্ণতা ও মানসিক চাপে ভুগছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু দিনে অন্তত ১ ঘণ্টা খোলা মাঠে কাটায়, তাদের তুলনায় গৃহবন্দী শিশুদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা ও একাকীত্বের হার ৪ গুণ বেশি।
তাদের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, গ্রামীণ পরিবারগুলোর মধ্যে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বাড়লেও সঠিক ব্যবহার বা 'ডিজিটাল লিটারেসি'র অভাব প্রকট। এরফলে শহুরে বস্তি এলাকার প্রায় ১৩.৪ থেকে ২২.৯ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। এমনকি পর্যাপ্ত খেলার মাঠের অভাব এবং অনলাইন জগতের প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক তাদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দক্ষতাকে কমিয়ে দিচ্ছে বলেও গবেষণায় এসেছে।
ইউনিসেফ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) যৌথভাবে 'মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে' পরিচালনা করে, যার সর্বশেষ তথ্য ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে কায়িক পরিশ্রমের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। এছাড়াও ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের একটি বড় অংশ (প্রায় ৩২ শতাংশ) অনলাইনে নেতিবাচক কনটেন্ট বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়। সার্ভেটির ৭-এর প্রাথমিক উপাত্ত বলছে, ১১.৩ শতাংশ শিশু এখনও শিশুশ্রমে নিযুক্ত থাকলেও বাকি শিশুদের মধ্যে বড় অংশই বিনোদনের জন্য মাঠের বদলে স্ক্রিনকে বেছে নিচ্ছে। এই অবস্থায় ইউনিসেফ সতর্ক করে বলছে, ডিজিটাল আসক্তির কারণে শিশুদের ভাষার বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে এবং এক-তৃতীয়াংশ শিশু পর্যাপ্ত 'উদ্দীপনামূলক পরিবেশ' (যেমন বই পড়া বা বাইরে খেলা) থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
শিশুদের মানসিক চাপ ও একাকীত্ব বাড়ছে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলার মাঠ এবং পার্ক না থাকায় কেবল বিনোদনের সংকট নয়; বরং বড় সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট। শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বাড়ছে, স্ক্রিন আসক্তি বাড়ছে, সামাজিক যোগাযোগ কমছে, মানসিক চাপ ও একাকীত্ব বাড়ছে। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি ও অপরাধ প্রবণতার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম জানান, মানুষের শারীরিক বিকাশ শুধু ভালো খাবারের ওপর নির্ভর করে না, এর সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমও জরুরি। তিনি বলেন, “শরীরকে সুস্থ ও পরিপুষ্ট রাখতে যেমন পুষ্টিকর খাবার দরকার, তেমনি দরকার ব্যায়াম, হাঁটা এবং শারীরিক সক্রিয়তা। কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে এই ব্যায়ামের সবচেয়ে স্বাভাবিক ও কার্যকর রূপ হচ্ছে খেলাধুলা।”
তিনি বলেন, শিশুদের আলাদা করে জোর করে ব্যায়াম করানো বা হাঁটানো বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু খেলাধুলার সুযোগ পেলে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দৌড়ায়, লাফায়, খেলে—এটাই তাদের শরীরচর্চার সবচেয়ে প্রাকৃতিক উপায়। “খেলার মধ্য দিয়েই শিশুদের শরীর সক্রিয় থাকে, শক্তি বাড়ে এবং শারীরিক বিকাশ ঘটে,” বলেন তিনি।
অধ্যাপক তাজুল ইসলাম আরও বলেন, “দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, শহুরে পরিবেশে শিশুদের জন্য সেই খেলার জায়গাটাই দিন দিন সংকুচিত হয়ে গেছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট—সবকিছু ঘন হয়ে গেছে। এখন অনেক এলাকায় শিশুদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ বা উন্মুক্ত স্থান নেই। আগে যে সরকারি মাঠগুলো ছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই এখন আর আগের মতো ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় নেই বা দখল-ব্যবহারের চাপে সংকুচিত হয়ে গেছে।”
তিনি বলেন, এর ফলে শিশুদের শারীরিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শুধু শরীর নয়, একই সঙ্গে তাদের মানসিক বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার ভাষায়, “শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটে মূলত সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। যখন তারা সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলে, কথা বলে, ঝগড়া করে আবার মিলে যায়—তখনই তারা সামাজিক দক্ষতা শেখে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এই মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই শিশু শেখে কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল, কোনটা গ্রহণযোগ্য, কোনটা অগ্রহণযোগ্য। ঘরে বসে শুধু উপদেশ দিয়ে বা বই পড়ে এই শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। বাস্তব পরিবেশে অন্যদের সঙ্গে মিশে অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই তাদের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে।”
অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন, “একটি শিশুর ভবিষ্যৎ আবেগীয় পরিপক্বতা, আচরণগত ভারসাম্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ অনেকটাই নির্ভর করে তার শৈশবের সামাজিক পরিবেশের ওপর। মাঠ, খেলার জায়গা এবং সমবয়সীদের সঙ্গে মেলামেশা সেই পরিবেশ তৈরি করে।”
তিনি শেষ করেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে, “শিশুদের জন্য নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা এখন আর বিকল্প নয়, এটি জরুরি। পাশাপাশি তাদের বিনোদনের জন্য নাচ, গান, আঁকা, আবৃত্তি বা অন্যান্য সৃজনশীল কার্যক্রমও বাড়াতে হবে, যাতে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণভাবে বেড়ে উঠতে পারে।”
তার মতে, বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির একটি বড় কারণ হলো মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার। “এটা একমুখী যোগাযোগ তৈরি করে, যেখানে শিশু শুধু গ্রহণ করছে কিন্তু বাস্তব জীবনের সামাজিক আদান-প্রদান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এতে তাদের সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে,” তিনি বলেন।
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে অভিভাবকদের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, নিয়মিত তদারকি এবং বিকল্পভাবে খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ ও পারিবারিক সময় বাড়াতে হবে।
যা ভাবছে সিটি কর্পোশন
দ্রুত নগরায়নের কারণে খোলা জায়গা ও খেলার মাঠ সংরক্ষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনও। সংস্থাটি বলছে, নতুন যুক্ত ওয়ার্ডগুলোতে খাস জমির স্বল্পতা, জমির মালিকানা জটিলতা এবং অনিয়ন্ত্রিত দখলের কারণে পরিকল্পিতভাবে পার্ক ও মাঠ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে সংস্থাটি দাবি করছে, বিদ্যমান পার্ক ও খেলার মাঠগুলোকে আধুনিকায়ন এবং দখলমুক্ত করার ওপর এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ডিএনসিসি আরও জানিয়েছে, প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে মানসম্মত খেলার মাঠ বা ছোট পার্ক তৈরির পরিকল্পনা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি কিছু সরকারি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সাধারণ শিশু-কিশোরদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, দীর্ঘমেয়াদে খোলা জায়গা বাড়ানো এবং বিদ্যমান জায়গাগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে শিশুদের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ নগর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।









