হাসিনার ফেরার হুঙ্কার: কূটচাল, নাকি গোপন বোঝাপড়া?

দিল্লির এক সুরক্ষিত বাসভবন থেকে ইদানীং মাঝেমধ্যেই কিছু বার্তা আর গুঞ্জন ভেসে আসে। সেই গুঞ্জনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চব্বিশের আগস্টে ছাত্র-জনতার উত্তাল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। দীর্ঘ প্রায় দেড় বছরের প্রবাসজীবন বা রাজনৈতিক নির্বাসন কাটিয়ে তিনি নাকি এবার সত্যিই দেশে ফিরছেন। ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে তিনি প্রস্তুত। এমনকি আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যেই ট্রাভেল পাসের আবেদন করে ‘বীরের বেশে’ ঢাকায় ফেরার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাও নাকি বাতাসে ভাসছে।
প্রশ্ন হলো- যার শাসনামলে সংঘটিত গণহত্যা, গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে, তিনি হঠাৎ করে কেন এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে যাবেন? এর পেছনে কি কেবলই রাজনীতিতে টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টা, নাকি ক্ষমতার অন্দরমহলে নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি হয়েছে?
গ্রামের চায়ের দোকান থেকে রাজধানীর রাজনৈতিক আড্ডা -সবখানেই এখন একই প্রশ্ন: শেখ হাসিনা কি সত্যিই ফিরবেন, নাকি এটিও বিগত দেড় বছরে দেওয়া বহু ঘোষণার মতো আরেকটি রাজনৈতিক বুলি?
সবচেয়ে বড় খটকা লাগছে বর্তমান সরকারের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির বক্তব্য এবং শেখ হাসিনার ভাষার অদ্ভুত সাদৃশ্য দেখে। সাধারণত চোর-পুলিশের খেলায় দুই পক্ষের ভাষা এক হওয়ার কথা নয়। অথচ এখানে দেখা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা বলছেন তিনি বিচারের মুখোমুখি হতে চান, আর দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদও সংবাদ সম্মেলনে বলছেন—সরকারও চায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হোন। এই যে উভয়ের কণ্ঠে একই আইনি সুর, এর ভেতরে কি কোনো গোপন বোঝাপড়া লুকিয়ে আছে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে এখন এই সমীকরণের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছেন। কারণ, যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া চলছে, সেই প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে খুব বেশি উচ্চকণ্ঠ অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। বরং সরকারের ঘনিষ্ঠ কিছু উপদেষ্টার বক্তব্যে ‘ইনসাফ’ ও ‘ন্যায়বিচার’ নিশ্চিত করার আশ্বাসই বেশি শোনা যাচ্ছে।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে দেশে ফিরিয়ে এনে নতুন করে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ দেওয়ার এই যে আইনি মোড়ক, তা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পর্দার আড়ালে কোনো আন্তর্জাতিক শক্তির মধ্যস্থতায় বর্তমান সরকার এবং ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসকের মধ্যে অলিখিত কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না—সেটিও এখন আলোচনায় উঠে আসছে।
এদিকে শেখ হাসিনা শুধু নিজের ফেরার কথাই বলছেন না, দেশের ভেতরে দলীয় নেতাকর্মীদেরও প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। অথচ আইনি বাস্তবতায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এখন চরম রাজনৈতিক সংকটে থাকা একটি দল। তাদের কার্যক্রম ঘিরে নানা বিধিনিষেধ ও বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের বক্তব্যে যেন নতুন এক আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে। দেড় বছর ধরে যে কর্মীরা আত্মগোপনে বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ছিলেন, তারা হঠাৎ করে কীসের জোরে এত সক্রিয় হয়ে উঠছেন —এই প্রশ্নও সাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
যদি সত্যিই শেখ হাসিনার এই কথিত প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাজপথে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আবারও সংঘাতময় হয়ে উঠতে পারে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দেশকে নতুন করে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতেই কি এই রাজনৈতিক চাল?
এই রহস্যের জট খুলতে হলে আমাদের একটু পেছনে তাকাতে হবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে বসে বিভিন্ন অডিও বার্তায় অনুসারীদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কখনো বলেছেন, ‘হঠাৎ ঢুকে পড়ব’, কখনো নেতাকর্মীদের ধমক দিয়েছেন কেন তারা রাজপথ দখল করছে না। কিন্তু এবারের বক্তব্যের সঙ্গে আগের হুমকির একটি বড় পার্থক্য আছে—এবার তিনি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করেছেন।
ভারতের বাংলাদেশ হাইকমিশনে ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করার খবরটি রাজনৈতিক বাজার গরম করার জন্য নিঃসন্দেহে একটি কৌশলী চাল। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দলের ভেতরে জমে থাকা হতাশা দূর করা। নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা, শীর্ষ নেতৃত্বের পলায়ন এবং সাংগঠনিক বিপর্যয়ে তৃণমূলের কর্মীরা যে মানসিক সংকটে ভুগছিলেন, তাদের চাঙ্গা করতেই এই ‘দিল্লি দরবারের হুঙ্কার’ ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে ‘গণতন্ত্রের রক্ষক’ হিসেবে তুলে ধরে বর্তমান সরকারের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করাও এর একটি উদ্দেশ্য হতে পারে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। আওয়ামী লীগের ভেতরের খবর যারা রাখেন, তারা জানেন—দলটি এখন এক ধরনের ‘রিফাইনমেন্ট’ বা অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দলের একাংশ চাইছিল শেখ হাসিনাকে সরিয়ে অথবা অন্তত তার পরিবারের বাইরে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কাউকে সামনে এনে নতুনভাবে রাজনীতিতে ফিরতে।
কিন্তু আশি পেরোনো শেখ হাসিনা চার দশক ধরে আগলে রাখা দলের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে মোটেও রাজি নন। ফলে দলের সংস্কারের যেকোনো উদ্যোগ কার্যত থেমে গেছে। উল্টো কট্টরপন্থী অংশটি দেশের ভেতরে ঝটিকা মিছিল, বিচ্ছিন্ন স্লোগান এবং উত্তেজনামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। তারা জনগণের ক্ষোভ এবং বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুযোগ খুঁজছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই ‘মরণকামড়’ কি সত্যিই কোনো বোঝাপড়ার ফল? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যখন জানায়, এক্সট্রাডিশন চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে, তখন সেটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলেই মনে হয়। কিন্তু একই সময়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার দোহাই দিয়ে তার সম্ভাব্য সাজা পুনর্বিবেচনার গুঞ্জন উঠলে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক কিছু প্রসিকিউটর বলছেন, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে প্রথমে আত্মসমর্পণ করতে হবে। কিন্তু এরপর সুপ্রিম কোর্ট তাকে আপিলের সুযোগ দেবে কি না, সেই প্রশ্ন এখনো স্পষ্ট নয়। এই আইনি মারপ্যাঁচের আড়ালে তাকে কোনো ধরনের ‘সেফ প্যাসেজ’ দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে কি না, সেই প্রশ্নও জনমনে ঘুরছে।
যদি কোনো বোঝাপড়া না-ই হয়ে থাকে, তাহলে নিষিদ্ধ ও বিতর্কিত অবস্থানে থাকা একটি দলের নেত্রী কীভাবে এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে ‘বীরের মতো’ দেশে ফেরার ঘোষণা দেন? দলের নেতারাও বলছেন, যেভাবে তিনি সামরিক বিমানে চড়ে দেশ ছেড়েছিলেন, সেভাবেই নাকি ফিরবেন। এই ধৃষ্টতা কি নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর কোনো ভূ-রাজনৈতিক কূটচাল?
ভারতের মাটিতে বসে এতদিন ধরে শেখ হাসিনা যে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন, তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বর্তমান সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে রাখা এবং দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তার এই প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। তিনি ভালো করেই জানেন, দেশে ফিরলে তাকে আইনি ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু তিনি হয়তো দেখতে চাইছেন—তার ফেরার খবরকে কেন্দ্র করে দেশের ভেতরে কতটা অস্থিরতা তৈরি করা যায়।
যদি তার সমর্থকেরা রাজপথে নেমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক মহলে এই বার্তা দেওয়া সহজ হবে যে বর্তমান সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ। সেই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিতে পারে চব্বিশের পরাজিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো।
কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ আর কোনো সংঘাত চায় না। তারা চায় দ্রব্যমূল্য কমুক, কর্মসংস্থান বাড়ুক, দেশে স্বস্তি ফিরুক। অথচ ক্ষমতার এই নোংরা খেলায় সাধারণ মানুষের জীবনকেই বারবার দাবার ঘুঁটি বানানো হচ্ছে। শেখ হাসিনার এই ‘ফেরার হুঙ্কার’ যদি শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নেয়, তবে তার দায় কে নেবে?
বর্তমান সরকার কি পারবে এই রাজনৈতিক চক্রান্ত মোকাবিলা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে, নাকি আইনি ইনসাফের নামে কোনো অদৃশ্য সমঝোতার পথেই হাঁটবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ১৫ আগস্টের মধ্যে ট্রাভেল পাস পাবেন কি না, কিংবা আদৌ ঢাকায় ফিরবেন কি না—তা সময়ই বলে দেবে। তবে তার এই বক্তব্য যে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে সন্দেহের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
ক্ষমতার অলিন্দে থাকা ব্যক্তিবর্গ এবং দিল্লির সুরক্ষিত প্রাসাদে বসে থাকা সাবেক শাসকের ভাষার এই অদ্ভুত মিলের রহস্য উদ্ঘাটন হওয়া জরুরি। কারণ দেশের মানুষ আর কোনো ফাঁকা বুলি, কূটচাল কিংবা গোপন সমঝোতার বলি হতে চায় না। তারা চায়, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের রক্তের সঙ্গে যেন কোনো আপস না হয়। বিচারের কাঠগড়া যেন সত্যিই ন্যায়ের প্রতীক হয়, কোনো রাজনৈতিক দাবার চাল নয়।
#লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক









