আ.লীগ ফেরার আট পথ, বাস্তবতা ও প্রতিবন্ধকতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি - বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা কি আবারও দ্রুত রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরতে পারবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউবভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে গত কয়েক মাস ধরে একটি ‘হাইপ’ তৈরি হয়েছে যে ছয় মাসের মধ্যেই আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঘটবে।
এই আলোচনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অসম্ভব বলে মনে হওয়া বহু ঘটনাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবে পরিণত হয়েছে। তবে আবেগ, প্রচার এবং বাস্তব রাজনৈতিক সমীকরণ এক জিনিস নয়। রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের জন্য কেবল ইচ্ছা নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পথ, অনুকূল পরিবেশ এবং গ্রহণযোগ্য কৌশল।
লেখাটি লিখতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের অন্তত আটটি পথ সামনে এসেছে। প্রতিটি পথেরই কিছু বাস্তবতা আছে, আবার বড় ধরনের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
- শেখ হাসিনার স্বেচ্ছায় দেশে ফেরা:
প্রথম সম্ভাবনা হলো— শেখ হাসিনা নিজেই দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, কারাগারে যাবেন এবং আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করবেন।
বাস্তবতা হলো, এই সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি অলিখিত ‘জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্ট’ ছিল—দেশের দুই প্রধান নেত্রীকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া হবে না। কিন্তু খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সমীকরণ কার্যত ভেঙে গেছে।
ফলে দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতেই হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও এই জায়গায় ছাড় দেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। শেখ হাসিনা নিজেও এই বাস্তবতা বোঝেন বলেই মনে হয়। তাই ‘ছয় মাসের মধ্যে ফেরা’ ধরনের বক্তব্যের বাস্তব ভিত্তি দুর্বল। ফিরতে চাইলে তিনি এখনই ফিরতে পারেন।
- ভারতের সামরিক বা কৌশলগত হস্তক্ষেপ:
দ্বিতীয় আলোচিত তত্ত্ব হলো— ভারত কোনো না কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করে আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় বসাবে। এই আশঙ্কা বা সম্ভাবনাও বাস্তবে খুব দুর্বল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দিল্লির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল স্থিতিশীলতা এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে রাষ্ট্র সাধারণত নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়।
ভারতের বর্তমান অবস্থান দেখলে মনে হয়, তারা সংঘাত নয়, বরং সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথেই হাঁটছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি বড় বাজার এবং বাণিজ্যিক অংশীদার। ফলে সামরিক ঝুঁকি নিয়ে রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কার্যত নেই বললেই চলে।
- সামরিক অভ্যুত্থান বা ক্যু:
আরেকটি তত্ত্ব হলো—বাংলাদেশে যদি কোনো সামরিক পরিবর্তন ঘটে, তাহলে আওয়ামী লীগ আবার রাজনৈতিক সুযোগ পেতে পারে।
তাত্ত্বিকভাবে এটি অসম্ভব নয়। কারণ, ইতিহাস বলে সামরিক শাসকরা প্রায়ই কোনো রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন খোঁজে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিক ধারার বাইরে যেতে আগ্রহী—এমন কোনো ইঙ্গিত দৃশ্যমান নয়।
বরং সাম্প্রতিক সংকটময় সময়গুলোতে তাদের অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত। যদি তারা সরাসরি ক্ষমতা নিতে চাইত, অতীতের অস্থির মুহূর্তগুলোতেই তা করতে পারত। সেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা তা করেনি। ফলে নিকট ভবিষ্যতে সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা খুবই কম।
- গণঅভ্যুত্থান বা সরকারবিরোধী বিস্ফোরণ:
বর্তমান সরকার যদি চরমভাবে ব্যর্থ হয়—অর্থনীতি ধসে পড়ে, মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, গুম-খুন ও ভোটাধিকার হরণের মতো ঘটনা বাড়ে—তাহলে নতুন গণবিক্ষোভ তৈরি হতে পারে। আর সেই পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত এমন পরিস্থিতির স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও বাংলাদেশ এখনো উৎপাদনক্ষম একটি দেশ। খাদ্য নিরাপত্তাও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। বড় ধরনের লুটপাট বা আর্থিক বিপর্যয় না ঘটলে তাৎক্ষণিক ধসের আশঙ্কা কম।
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের ওপর ‘আওয়ামী লীগ’ তকমা দিয়ে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হলে সেটিও উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সে ধরনের প্রবণতা এখনো স্পষ্ট নয়।
- দায় স্বীকার ও রাজনৈতিক সমঝোতা:
সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ সম্ভবত এটিই—দলটি জুলাইয়ের ঘটনাবলি এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় স্বীকার করবে, অভিযুক্ত নেতাদের সরিয়ে দেবে এবং রাজনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটবে।
কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো—শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এটি সম্ভব কি না। তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে প্রকাশ্য ‘সরি’ বলা বা দায় স্বীকারের সংস্কৃতি খুব একটা যায় না। ফলে এই পথের প্রধান বাধা রাজনৈতিক মানসিকতা।
তবে দীর্ঘমেয়াদে দল বাঁচাতে আওয়ামী লীগকে শেষ পর্যন্ত এই পথেই হাঁটতে হতে পারে।
- আদালতের মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন:
আওয়ামী লীগ যদি নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক বাধার বিরুদ্ধে আদালতে যায়, তাহলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেরার চেষ্টা করতে পারে।
এটি তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পথ হলেও অত্যন্ত দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত। আদালত যদি দলটির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে, তাহলে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। আর শেখ হাসিনা নেতৃত্বে থাকলে এই পথেও রাজনৈতিক জটিলতা থেকেই যাবে।
- অন্য নামে বা নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে ফেরা:
বিশ্বের বহু দেশে নিষিদ্ধ বা সংকটে পড়া রাজনৈতিক দল নতুন নামে ফিরে এসেছে। আওয়ামী লীগও তেমন কোনো কৌশল নিতে পারে—অন্য দল বা প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে একীভূত হয়ে।
কিন্তু এখানেও মূল বাধা নেতৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা। নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেই জনগণের আস্থা ফিরে আসে না। তাছাড়া নতুন রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ক্ষমতায় পৌঁছানোও দীর্ঘমেয়াদি ও অনিশ্চিত প্রক্রিয়া।
- কোনো পরাশক্তির সহায়তায় প্রত্যাবর্তন:
অনেকে মনে করেন, কোনো বৈশ্বিক শক্তি হয়তো আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনবে।
কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতা এখন অনেক বদলে গেছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের মতো আদর্শভিত্তিক ব্লক রাজনীতি এখন আর নেই। বর্তমান বিশ্ব মূলত অর্থনীতি, বাণিজ্য ও কৌশলগত স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
চীন হোক বা পশ্চিমা শক্তি—সবাই এখন স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে শুধুমাত্র কোনো দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য বড় শক্তিগুলো সরাসরি ঝুঁকি নেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
শেষ কথা এবং বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগের দ্রুত প্রত্যাবর্তনের পথ অত্যন্ত কঠিন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন সাধারণত ঘটে তখনই, যখন সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে রাস্তায় নেমে আসে। কেবল দলীয় নেতাকর্মী দিয়ে বড় রাজনৈতিক পালাবদল সম্ভব হয় না।
আর যে জনগোষ্ঠী কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তারা হঠাৎ করেই সেই দলের ডাকে আবার রাস্তায় নামবে—এমন সম্ভাবনাও আপাতত ক্ষীণ।
তাই আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে—দায় স্বীকার, বিতর্কিত ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়া, রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং নতুন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা। অন্যথায় ‘ছয় মাসে প্রত্যাবর্তন’ ধরনের আলোচনাগুলো রাজনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে বেশি আবেগনির্ভর বলেই মনে হয়।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক









