ধর্ষক-খুনিদের জন্য কি নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠছে বাংলাদেশ?
আইনের দুর্বলতা-রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বাড়ছে নৃশংসতা

পাপের কোনো বয়স নেই। কিন্তু যখন সেই পৈশাচিক পাপের শিকার হয় আট বছরের এক নিষ্পাপ শিশু, তখন কেঁপে ওঠে পুরো সমাজের বিবেক। রাজধানীর পল্লবীর ঘটনাটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে পড়া অন্ধকারের এমন এক ভয়াবহ রূপ, যা মানুষের সুপ্ত চেতনাকেও প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসাকে যেভাবে ফুসলিয়ে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং পরে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করা হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়।
এই একটি ঘটনা যেন বাংলাদেশের ভেঙে পড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামাজিক পচনের জীবন্ত দলিল হয়ে সামনে এসেছে। রামিসার করুণ পরিণতি স্তব্ধ করে দিয়েছে সাধারণ মানুষকে, আর রাজনীতিতে তৈরি করেছে ব্যাপক আলোড়ন।
পল্লবীর এই চরম নৃশংসতার পর দেশের সরকারপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিহত রামিসার বাসায় গিয়েছেন। শোকার্ত বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সান্ত্বনা দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে এই সান্ত্বনার পেছনে এক ধরনের চেনা নাটকের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। মানুষ ভুলে যায়নি, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাও তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, পরম মমতার ভঙ্গিতে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। অথচ সেই সান্ত্বনা ছিল এক নির্মম রাজনৈতিক প্রহসন। যাঁদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠেছিল, তাঁরাই আবার সহমর্মিতার অভিনয় করেছিলেন।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও একই নাটক করছেন, এমনটা আমরা মনে করি না। তবে রামিসার পরিবারের জন্য আজ কেবল সান্ত্বনার বাণী কিংবা চোখের জল যথেষ্ট নয়। যেমন শেখ হাসিনার সান্ত্বনা ইলিয়াস আলীর পরিবারকে কিছুই দেয়নি, তেমনি রামিসার পরিবারও কেবল সহানুভূতি নয়, চায় ন্যায়বিচার। এমন দৃষ্টান্তমূলক বিচার, যা দেখে আর কোনো অপরাধী কোনো শিশুর দিকে হাত বাড়ানোর সাহস না পায়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সেই কাঙ্ক্ষিত বিচার নিয়েও সরকারের আচরণে এক ধরনের ধোঁয়াশা ও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে ক্রমেই হতাশ করে তুলছে।
রামিসার ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি বিস্তৃত ও ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধির অংশ। গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে শিউরে ওঠার মতো চিত্র সামনে আসে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র সাড়ে চার মাসে দেশে ১১৮টি কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে। শুধু মে মাসের প্রথম বিশ দিনেই ২৪টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং পাঁচজনকে হত্যা করা হয়েছে। চারদিকে যেন শুধু শিশুর রক্ত আর কান্না।
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে ১০ বছরের এক কন্যাশিশুকে তার নিজের আত্মীয় ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেছে, কারণ শিশুটি তার মায়ের কাছে সব বলে দেওয়ার কথা বলেছিল। ঘরের ভেতর, চেনা পরিবেশে, আত্মীয় বা প্রতিবেশীর হাতে শিশুদের অনিরাপদ হয়ে ওঠা প্রমাণ করে অপরাধীদের মনে আইনের কোনো ভয় অবশিষ্ট নেই। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম চার মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় প্রায় ছয় হাজার মামলা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যাই বলে দেয়, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা গভীর সংকটে নিমজ্জিত।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতির পেছনে সরকারের ধীরগতি, স্থবিরতা এবং এক ধরনের গা-ছাড়া মনোভাবকে প্রধানত দায়ী করা যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, সরকার খুব বেশি সময় পায়নি এবং পুরো দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তিনি আরও সময় চেয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—অপরাধীরা কি পুলিশকে সময় দিচ্ছে? তারা তো প্রতিদিন একের পর এক অপরাধ ঘটিয়েই চলেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ‘সময় চাই’ বক্তব্য আসলে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং আইন প্রয়োগের ধীরগতিরই বহিঃপ্রকাশ।
চাঞ্চল্যকর মামলার তালিকা তৈরি করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার যে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে। পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অপরাধ দমন এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই মন্থর গতি অপরাধীদের আরও বেশি সাহসী ও বেপরোয়া করে তুলছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় রাজনীতির নোংরা সমীকরণের কারণে। দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেবে, সেই পথ অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বিএনপি-সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠছে। ক্ষমতার পালাবদল কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, অথবা পার পাওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন কোনো অপরাধীর পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়া দেখতে পায়, তখন তাদের হাত সংকুচিত হয়ে আসে। দলীয় পরিচয়ের কারণে যখন অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হয় কিংবা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তখন আইনের শাসন মুখ থুবড়ে পড়ে। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় না এনে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিষ্ক্রিয় থাকা বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।
ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবি বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন নয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও দীর্ঘদিন ধরে এ দাবি জানিয়ে আসছে। এ বিষয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে এমন কিছু মন্তব্য করেছেন, যা নতুন করে বিতর্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তিনি ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের দাবিকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। অথচ বিদ্যমান আইনেই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে যখন সরকার ব্যর্থ, তখন এ ধরনের মন্তব্য অপরাধীদের মনোবল বাড়িয়ে দেয় বলেই সাধারণ মানুষের আশঙ্কা।
একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের একটি অংশের মনে গভীর আঘাতও দিয়েছে। তাঁদের মতে, প্রকাশ্য বিচার বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ইসলামী শরিয়া আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিচারব্যবস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও এ মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। দলটির নেতারা বলেছেন, সরকারের অনেক নেতা প্রায়ই ‘মদিনার সনদের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা’র কথা বলেন, অথচ বাস্তবে ইসলামী বিচারনীতিকে অবজ্ঞা করেন। তাঁদের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য রাজনৈতিক ও আদর্শিক দ্বৈততারই বহিঃপ্রকাশ।
বিচার প্রক্রিয়ার এই ধোঁয়াশা ও স্থবিরতা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মনে গভীর সংশয় তৈরি করছে। প্রাক্তন বিচারকদের অনেকেই মনে করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে দেশে বিদ্যমান আইন যথেষ্ট; সংকট মূলত এর সঠিক প্রয়োগে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের অদক্ষতা, গাফিলতি এবং আর্থিক লেনদেনের কারণে তদন্ত প্রতিবেদন দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে অপরাধীরা সহজেই আইনের ফাঁক গলে জামিনে বেরিয়ে আসে অথবা খালাস পেয়ে যায়। বিচারকের স্বল্পতা এবং মামলার বিশাল জটের কারণে একটি মামলার রায় হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের মনে এমন ধারণা তৈরি করে যে, অপরাধ করলেও শেষ পর্যন্ত পার পাওয়া সম্ভব।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার যে সদিচ্ছা সরকারের থাকা উচিত ছিল, তার স্পষ্ট অভাব দেখা যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সরকারের মনোভাবে যদি অপরাধীদের শাস্তির প্রশ্নে এমন দ্বিধা ও তাত্ত্বিক বিতর্ক চলতেই থাকে, তবে পল্লবীর রামিসা কিংবা সিরাজদীখানের সেই শিশুর পরিবার কোনোদিন প্রকৃত ন্যায়বিচার পাবে কি না—সেটি নিয়েই সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের সংশয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই নৃশংসতার পেছনে শুধু আইন-শৃঙ্খলার অবনতিই নয়, বরং গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ও কাজ করছে। সমাজে মাদকাসক্তির ভয়াবহ বিস্তার, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকৃত ও অশ্লীল কনটেন্টের সহজলভ্যতা মানুষের মনস্তত্ত্বকে বিকৃত করে তুলছে। পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার অভাব মানুষের ভেতর থেকে মানবিকতা ও সহমর্মিতা কেড়ে নিচ্ছে। মানুষ যখন দেখে অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়, তখন তার ভেতরের পাশবিক প্রবৃত্তি জেগে ওঠে এবং তা সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণকে ভেঙে ফেলে। শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হওয়ায় তারা সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। অপরাধীরা মনে করে, শিশুদের হত্যা করলে কোনো সাক্ষী থাকবে না—আর এই ধারণাই তাদের আরও বেশি নৃশংস করে তুলছে।
একটি সমাজ কতটা সভ্য, তা পরিমাপ করা হয় সেই সমাজে শিশুরা কতটা নিরাপদ তার ভিত্তিতে। আমাদের সংবিধান ও জাতীয় শিশু নীতিতে শিশুদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও অধিকারের কথা বলা থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঘর, বিদ্যালয় কিংবা রাস্তা—আজ কোথাও শিশুরা নিরাপদ নয়। এই পরিস্থিতি যদি চলতেই থাকে, তবে পুরো সমাজ একসময় বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। সরকার যদি সত্যিই আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন চায়, তবে শুধু মুখের আশ্বাসে চলবে না। রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের দমন করতে হবে—তারা যে দলেরই হোক না কেন।
একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য প্রত্যাহার করে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হবে। রামিসার খুনিদের এবং দেশের সব শিশু হত্যাকারীর বিচার দ্রুততম সময়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের এই স্থবিরতা ও দ্বিধা কাটিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমেই কেবল দেশকে এই অন্ধকারের গ্রাস থেকে রক্ষা করা সম্ভব। অন্যথায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ একদিন দাবানলের মতো বিস্ফোরিত হতে পারে।









