সিলেকটিভ নয়, ন্যায়বিচারই হোক মূল লক্ষ্য: বাংলাদেশের গণহত্যা প্রশ্নে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

ভারতীয় গণমাধ্যম ‘দ্য প্রিন্ট’-এ ১৬ মে ২০২৬ তারিখে আনোয়ার খান নামে এক বিশ্লেষকের লেখা ‘স্টপ সিলেকটিভ প্রসিকিউশন অব আওয়ামী লীগ’ শিরোনামের প্রবন্ধটি পড়লাম। তিনি নিজেকে ঢাকার রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণকারী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু তার এই লেখায় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে তিনি ‘ভুলে’ গেছেন বলে মনে হয়েছে।
আনোয়ার খান যদি সত্যিই মুক্তিযোদ্ধা হন, তাহলে তার কণ্ঠে বাংলাদেশের গণহত্যার প্রতিবাদ থাকার কথা, পক্ষপাতদুষ্ট বিচারের বাহানা নয়। তিনি লিখেছেন ‘সিলেকটিভ বিচার’ যেন বন্ধ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ১৯৭১ সালের পর যে ঘৃণ্য ঘটনা বাংলাদেশ দেখেছে—১৪০০ নিরপরাধ মানুষ, যাদের মধ্যে ছিল শিশু, নারী ও শিক্ষার্থী, তাদের হত্যা—সেই বিচার কোথায়? জাতিসংঘের প্রতিবেদন যেখানে স্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই হত্যাকাণ্ডের তথ্য দিয়েছে, সেটা তার লেখায় অনুপস্থিত।
তিনি দাবি করেন, বেশিরভাগ মামলায় দুর্বল প্রমাণ আছে বা সিলেক্টিভলি মামলা করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী দুর্নীতি, ধর্ষণ, হত্যা, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত ছিল—যার দলিল আজ সবার সামনে। গণমাধ্যমে প্রতিদিন এসব সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন কেবল সেইসব অপরাধের জমাট বাঁধা প্রমাণ। তাহলে ‘সিলেকটিভ প্রসিকিউশন’ বলতে আসলে কী বোঝাতে চান আনোয়ার?
আনোয়ার খান তার লেখায় আদালত ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর পবিত্রতার কথা বলেছেন, যা সঠিক। কিন্তু তিনি কি বলেননি যে, বাংলাদেশের বর্তমান বিচার বিভাগের উপর জনগণের আস্থা ইতিবাচক? আওয়ামী লীগের আমলে যারা বিচারের বাইরে ছিলেন, আজ তারা আইনের আওতায় আসছেন। এটা যদি সিলেকটিভ হয়, তাহলে সেটা জনগণের দাবির কাছে সিলেকটিভ।
তিনি বলেছেন, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয়ার অপরাধে আওয়ামী লীগের ১৯ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটা কি সত্য নয় যে ‘জয় বাংলা’ একটি দেশাত্মবোধক স্লোগান, কিন্তু সেটি যদি কোনো সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যকলাপের প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার করা হয়, তাহলে আইন তার জবাব চায়? বরং প্রশ্ন হলো, যেসব আওয়ামী লীগ নেতা হত্যা ও নিপীড়নের নির্দেশ দিয়েছেন, তারা কেন এতদিন ধরেই গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলছেন?
আনোয়ারের মতো কেউ যদি দেশের গণতন্ত্রের কথা বলেন, তাহলে তাকে স্বীকার করতেই হবে—বাংলাদেশ আজ এমন এক টার্নিং পয়েন্টে আছে, যেখানে দল চাইছে না, বিচার চাইছে জনতা। আওয়ামী লীগ এবং তাদের অনুসারীরা নৃশংসতা চালিয়েছে, জাতিসংঘ সেটা প্রমাণ করেছে। এখন সেই বিচার কার্যকর করছে বর্তমান সরকার, সেটা বিএনপির সরকারই হোক বা অন্য কেউ।
সংবিধানিক গণতন্ত্রে আইনের সামনে সমতা মানে অপরাধ যারই হোক, বিচার তাকে পেতে হবে। দুর্বল প্রমাণের মামলার সমালোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু গণহত্যার মামলাকে ‘ সিলেকটিভ প্রসিকিউশন’ বলে গিলিয়ে ফেলার চেষ্টা ইতিহাসের সাথে প্রতারণা।
বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা তখনই ফিরবে, যখন আপাত দৃষ্টিতে ক্ষমতাশীল ও দুর্বল সবার ক্ষেত্রেই বিচার একই চোখে দেখা হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে বৈধতা দেয়ার জন্য নৃশংসতাকে ঢাকা দেয়া যাবে না। আনোয়ার খান যাকে ‘ক্রেডিবিলিটি’ বলছেন, বাংলাদেশের প্রকৃত সুনাম নির্ভর করে সেই বিচারের সুষ্ঠু সমাপ্তির ওপর, যেখানে ভিকটিমরা ন্যায় পায়। এবং সেই ন্যায়ের পথে ‘সিলেকটিভ’ কিছু নয়, বরং পুরো গণহত্যার দায় কারও না কারও তো নিতে হবে।
আনোয়ার খান যদি সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষ হন, তাহলে তিনি এও জানেন, ‘৭১-এ আমরা যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলাম, তাদের কর্মপদ্ধতি যেন এই দেশে কেউ পুনর্ব্যবহার না করে। আওয়ামী লীগের বিচার দরকার, সিলেকটিভ প্রসিকিউশন নয়—পূর্ণ ও প্রমাণভিত্তিক বিচার। তবেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন সার্থক হবে।









