পরিবর্তিত ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ: ভারসাম্যের কূটনীতি নাকি নতুন পথ?

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ইরান উত্তেজনা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি প্রবেশ করেছে নতুন অনিশ্চয়তার পর্যায়ে। এসব সংকট শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানিবাজার, নিরাপত্তা কাঠামো ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিতেও পড়ছে গভীর প্রভাব। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ফলে দেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. শাহিদুজ্জামানের একটি সামাজিকমাধ্যম পোস্ট এই আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে। তাঁর ভাষা আবেগঘন ও কঠোর হলেও এতে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি ভবিষ্যতে আরও স্বাধীন ও বহুমুখী কৌশলগত অবস্থান নিতে চায়? এটি কেবল রাজনৈতিক আলোচনা নয়, বরং এমন এক কৌশলগত বাস্তবতা যেখানে ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে নিজেদের অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
একক নির্ভরতার যুগ কি শেষ?
গত এক দশকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক গভীর হয়েছে। যোগাযোগ, জ্বালানি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় এক অপরিহার্য অংশীদার। কিন্তু কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়ে গেছে। তিস্তা চুক্তি ঝুলে আছে, সীমান্ত হত্যা নিয়ে উদ্বেগ কমেনি। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বাণিজ্যে বিশাল অসমতা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করলেও ওই সময়ে ভারতেই রপ্তানি করেছে মাত্র ১.৫৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এই বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বাড়ছে নতুন ভাবনা। একক নির্ভরতার বদলে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চীনের উত্থান ও কৌশলগত বাস্তবতা
চীন এখন শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নয়, বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রীয় খেলোয়াড়। বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে। পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ এর উদাহরণ। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিআইপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বড় অংশ আসে চীন থেকে।
বাণিজ্যের তথ্যও বলছে অন্য কথা। চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ২৪.০৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চীন বাংলাদেশে রপ্তানি করেছে ২২.৮৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অপরদিকে বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি করেছে মাত্র ১.১৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এই চিত্র ভারতের মতোই—বিপুল আমদানি আর নগণ্য রপ্তানি।
ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক থেকে কৌশলগত মাত্রায় প্রবেশ করছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন: বাংলাদেশ কি কোনো একক শক্তির দিকে ঝুঁকবে, নাকি ভারসাম্য বজায় রাখবে? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বর্তমান প্রবণতা বলছে, সবচেয়ে কার্যকর নীতি হলো ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’—একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা।
যুক্তরাষ্ট্র: পুরনো বাজারের নতুন চিত্র
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানিগন্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সেখানেও চিত্র বদলাচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে ৭৯১ মিলিয়ন ডলার। আমদানি করেছে ২০৩ মিলিয়ন ডলার। ফলে ইতিবাচক বাণিজ্য ভারসাম্য ৫৮৭ মিলিয়ন ডলার। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, রপ্তানি কমছে। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমেছে ৩৮.৮ মিলিয়ন ডলার বা ৪.৬৮ শতাংশ। অন্যদিকে আমদানি বেড়েছে ৬৬.১ মিলিয়ন ডলার বা ৪৮.৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকখাতের প্রতিযোগিতা বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন ভাবনার কারণ।
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক: আবেগ নয়, স্বার্থ
বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক ইতিহাসের কারণে সংবেদনশীল। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই—স্বার্থই মূল নিয়ামক। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় পাকিস্তান তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান রেখেছে; ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গেই কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছে এটি।
বাণিজ্যের তথ্যও বলছে, সম্পর্ক বদলানোর সুযোগ আছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাকিস্তানে রপ্তানি করেছে ৬১.৯৮ মিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩১.৭৮ শতাংশ কম। অথচ একই সময়ে পাকিস্তান থেকে আমদানি ছিল ৬২৭.৮ মিলিয়ন ডলার। শুধু ২০২৪–২৫ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরেই পাকিস্তান থেকে আমদানি দাঁড়িয়েছে ৩৭২.১ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাণিজ্য ঘাটতি প্রকট। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকে ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা ও আঞ্চলিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে এই সম্পর্ক নতুন করে ভাবতে হবে।
তুরস্কের কূটনৈতিক মডেল: শিক্ষণীয়
তুরস্ক একই সঙ্গে ন্যাটো সদস্য, রাশিয়ার সঙ্গী ও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি। ইউক্রেনের খাদ্যশস্য চুক্তিতে মধ্যস্থতা তার কূটনৈতিক সামর্থ্যের বড় উদাহরণ। আন্তালিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরাম আজ বিশ্বকূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আসর। বাংলাদেশও এখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে—একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা সম্ভব।
ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি কি দুর্বলতা?
ড. শাহিদুজ্জামান মনে করেন, ভারসাম্যপূর্ণ নীতি দুর্বলতা তৈরি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক দেখায়, একই রাষ্ট্র একদিকে সহযোগিতা, অন্যদিকে প্রতিযোগিতা—দুটোই চালায়। সিঙ্গাপুরের কিশোর মহব্বানি বলেছেন, ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বড় শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারা।
বাণিজ্যের তথ্য বলছে, চীন ও ভারত থেকে বাংলাদেশের বিপুল আমদানি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি কমছে। পাকিস্তানের সঙ্গেও ঘাটতি বাণিজ্য। এই বাস্তবতায় একক কারও ওপর নির্ভর না করে সব দেশের সঙ্গেই ‘স্বার্থের কূটনীতি’ চালানো ছাড়া বিকল্প নেই বাংলাদেশের।
শক্তি ও নৈতিকতার ভারসাম্য
ম্যাকিয়াভেলি বলেছিলেন, রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য শক্তি অপরিহার্য। কান্ট স্থায়ী শান্তির জন্য নৈতিক কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছিলেন। আধুনিক রাষ্ট্র জানে—এই দুইয়ের মাঝামাঝি পথই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত।
শেষ কথা
বাংলাদেশ এখন এমন ভূরাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে ভুল কৌশল বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সঠিক ভারসাম্য আবার নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, প্রাতিষ্ঠানিক ও ঐকমত্যভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি—যেখানে সব দল ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ থাকবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্মান পায় সেই রাষ্ট্রই, যে শুধু প্রতিক্রিয়া জানায় না; বরং নিজের কৌশল নিজেই তৈরি করে, নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে এবং প্রয়োজনে বড় শক্তিগুলোর মাঝেও নিজের জায়গা নিজেই তৈরি করে নেয়।









