১০ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি, বেশিরভাগই 'বিএনপিপন্থী'!

দেশের ১০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে নতুন উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তবে নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা রাজনৈতিকভাবে পরিচিত হওয়ায় উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপাচার্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক পদে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং প্রশাসনিক দক্ষতা, গবেষণা ও শিক্ষাগত অবদানকে প্রধান বিবেচনায় রাখা উচিত।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এ সংক্রান্ত আলাদা ১০টি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
নতুন উপাচার্য পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠন ইউট্যাবের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি হিসেবে পরিচিত। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করিমও একই সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। অন্য কয়েকজনের বিরুদ্ধেও বিএনপি-ঘনিষ্ঠ শিক্ষক রাজনীতির অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও শিক্ষক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দলীয় বিবেচনার এই সংস্কৃতি আদৌ পরিবর্তিত হচ্ছে কি না। তাদের মতে, দলমতের ঊর্ধ্বে থেকেও বহু যোগ্য শিক্ষক বছরের পর বছর উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক আনুগত্যকে বড় যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়। আগে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা সুবিধা পেতেন, এখন বিএনপিপন্থিদের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও একাডেমিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সাবেক প্রশাসক বলেন, “ভিসি পদ শুধু প্রশাসনিক নয়, এটি একাডেমিক নেতৃত্বের জায়গা। এখানে দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে গবেষণা, আন্তর্জাতিক সংযোগ, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও সংকট মোকাবিলার দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।”
শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়বে। তাদের ভাষ্য, অনেক নিরপেক্ষ ও উচ্চমানের গবেষক শিক্ষক রয়েছেন, যারা কোনো রাজনৈতিক বলয়ে সক্রিয় না থাকায় কখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পান না।
শিক্ষা বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব নির্ধারণে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রধান মানদণ্ড বানানো হলে প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে দলীয় প্রভাবের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের উচিত একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য সার্চ কমিটির মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করা।”
তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেই দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং ক্যাম্পাস ব্যবস্থাপনায় দক্ষ। তাদের দাবি, বর্তমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নবনিযুক্ত ভিসিরা যোগদানের তারিখ থেকে চার বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন। দায়িত্ব পালনকালে তারা বর্তমান পদের সমপরিমাণ বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা ভোগ করবেন। একই সঙ্গে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ও আচার্য প্রয়োজনে যেকোনো সময় এ নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দলীয় আনুগত্যের চর্চা থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। অন্যথায় সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকবে।









