বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সমীকরণ
গেরুয়া উত্থানে এপার-ওপারে ‘উদ্বেগ’

উত্তাল গঙ্গার ঢেউ যেমন দুই তীরের জনপদকে সিক্ত করে, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ঢেউও আছড়ে পড়ে বাংলাদেশের উপকূলে। কিন্তু এবার গঙ্গার সেই চিরচেনা স্রোতে যেন আগুনের হলকা। পনেরো বছরের মমতা যুগের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মসনদে এখন উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি। প্রথমবারের মতো সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে বিজেপির বিজয় বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি প্রতিবেশী রাজ্যের পালাবদল নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক গভীর ও প্রচ্ছন্ন সংকটের ইঙ্গিত।
কলকাতার রাজপথে যখন বুলডোজারের গর্জন শোনা যায় আর মিছিলে প্রতিধ্বনিত হয় বাংলাদেশবিরোধী স্লোগান, তখন সীমান্তের এপারের সাধারণ মানুষের মনে শঙ্কা জাগাটাই স্বাভাবিক। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্ষমতার এই রূপান্তর দুই দেশের সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
বাংলার মানুষ বরাবরই সহজ-সরল। তারা ডাল-ভাত আর শান্তির খোঁজে বিভোর থাকে। কিন্তু রাজনীতির কূটকৌশল যখন সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে ঘরে ঢোকে, তখন আর শান্তিতে থাকা যায় না। বিজেপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা নির্বাচনী প্রচারণায় যেভাবে ‘বাংলাদেশ কার্ড’ ব্যবহার করেছেন, তা ছিল নজিরবিহীন। ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে সাধারণ মুসলমানদের দিকে আঙুল তোলা, নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার হুমকি আর ‘পুশ-ব্যাক’-এর ভয়—সব মিলিয়ে এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মুখে যখন বারবার ‘বাংলাদেশি রোহিঙ্গা’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দগুলো শোনা যায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে আগামীর দিনগুলো খুব একটা সুখকর হবে না।
বিজেপির এই জয়ের পেছনে কাজ করেছে এক সুগভীর সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ। তারা পশ্চিমবঙ্গকে এক অদ্ভুত আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—যেখানে লড়াইটা উন্নয়ন বা রুটি-রুজির নয়; বরং হিন্দু বনাম মুসলিমের, শরণার্থী বনাম অনুপ্রবেশকারীর। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি)-এর মতো বিষয়গুলোকে বিজেপি তাদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে মতুয়া সম্প্রদায়ের মতো পিছিয়ে পড়া হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা এক বিশাল ভোটব্যাংক তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, মুসলমানদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার যে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, তাকে অনেক বিশ্লেষকই ‘গণতান্ত্রিক পরিশুদ্ধি’র নামে সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন বলে অভিহিত করছেন। প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়া এবং তার বড় অংশই মুসলিম হওয়া কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত কেবল একটি রেখা নয়; এটি লাখো মানুষের নাড়ির টান। দুই দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি আর জীবনযাত্রা এই সীমান্তকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর ও আগ্রাসী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিএসএফের তৎপরতা বৃদ্ধি, সীমান্ত হত্যা এবং তথাকথিত অনুপ্রবেশ ঠেকানোর নামে নিরীহ মানুষের ওপর নিপীড়ন বাড়তে পারে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যেই সীমান্তে বিজিবিকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পুশ-ইনের যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছেন তারা।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—প্রতিবেশী দেশের একটি উগ্রবাদী রাজনৈতিক শক্তি যখন প্রশাসনযন্ত্রকে হাতে পায়, তখন কেবল বিজিবি দিয়ে কতক্ষণ স্থিতিশীলতা রক্ষা করা সম্ভব?
তিস্তা চুক্তির বিষয়টি দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ঝুলে আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার রাজ্যের স্বার্থের দোহাই দিয়ে এই চুক্তিতে বাধা দিয়েছেন। এখন কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দল, অর্থাৎ বিজেপির ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এবার বোধহয় তিস্তার জট খুলবে। কিন্তু রাজনীতির অলিগলি এত সহজ নয়। বিজেপি কি সত্যিই বাংলাদেশের স্বার্থে বা সমতার ভিত্তিতে পানি দেবে? নাকি তারা এই ইস্যুটিকে আরও বড় কোনো রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার বানাবে?
পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় কৃষক ও রাজনীতিকদের মধ্যে তিস্তার পানি নিয়ে যে আবেগ ও সেন্টিমেন্ট রয়েছে, বিজেপি কি তার বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশের বন্ধুত্বের হাত ধরবে? বিশ্লেষকরা বলছেন, তিস্তা এখন ভারতের নতুন প্রশাসনের জন্য এক ‘অগ্নিপরীক্ষা’। যদি তারা দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না করে, তবে প্রমাণিত হবে যে মমতা কেবল একটি অজুহাত ছিলেন; প্রকৃত অনীহা ছিল দিল্লিরই।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গের এই পরিবর্তন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। জামায়াতের নেতারা আশঙ্কা করছেন, ওপারে হিন্দুত্ববাদী শক্তির উত্থান এদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চক্রান্তে ব্যবহৃত হতে পারে। বিজেপি নেতারা যেভাবে এদেশের অস্থিতিশীলতাকে নিজেদের রাজনৈতিক পুঁজি বানান, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর বর্তমান নির্বাচিত সরকার সম্পর্ক উন্নয়নের যে চেষ্টা চালাচ্ছিল, পশ্চিমবঙ্গের এই গেরুয়া ঢেউ তাকে অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কলকাতার নিউ মার্কেটে গরুর মাংসের দোকানে বুলডোজার চালানো কিংবা মসজিদ ভাঙার মতো ঘটনাগুলো যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন বাংলাদেশের মানুষের মনেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই ক্ষোভকে ব্যবহার করে এ দেশের ভেতরেও অস্থিরতা তৈরির চক্রান্ত হতে পারে।
বিজেপির রাজনীতি মূলত দাঁড়িয়ে আছে ‘ভয়ের বয়ান’ বা ‘মরাল প্যানিক’-এর ওপর। তারা সাধারণ হিন্দু ভোটারদের মনে এই বিশ্বাস ঢোকাতে সক্ষম হয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীতে ভরে গেছে এবং তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন। এই কাল্পনিক ভীতিই তাদের ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু এর প্রভাব পড়ছে সীমান্তের এপারে। যখন ওপারে মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়, তখন এপারেও তার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। দুই বাংলার শান্তিপ্রিয়, অসাম্প্রদায়িক মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি এক বড় পরীক্ষা।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও বাংলাদেশ এক নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে। বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তের বাণিজ্য, ট্রানজিট সুবিধা এবং পর্যটন—সবই এখন পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর অনেকাংশে নির্ভর করবে। যদি রাজনৈতিক তিক্ততা বাড়ে, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাণিজ্যের ওপর। নিত্যপণ্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা এদেশের বাজার ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি করবে। এছাড়া ভিসা প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি বা ভ্রমণে অসহযোগিতার মতো ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেবে। ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি কি তবে কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি পশ্চিমবঙ্গের নতুন শাসকদল দিল্লির নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সৌহার্দ্যের পথে হাঁটবে? অধিকাংশ বিশ্লেষক এই প্রশ্নের জবাবে নেতিবাচক আশঙ্কাই প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, পররাষ্ট্রনীতি রাতারাতি পরিবর্তন হয় না। তবে রাজ্য সরকারের উগ্রতা যদি কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তবে দিল্লিও হয়তো কঠোর হওয়ার চেষ্টা করবে। মোদি সরকার এখন উত্তর-পূর্ব ভারতের সংযোগ এবং বঙ্গোপসাগরীয় কৌশলের জন্য বাংলাদেশকে আগের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের আবেগপ্রবণ ও আদর্শিক অবস্থান অনেক সময় দিল্লির হিসাবি কূটনীতিকেও ছাপিয়ে যায়। আসামের হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং পশ্চিমবঙ্গের শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতারা নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে প্রায়ই বাংলাদেশবিরোধী বিষোদ্গার করেন। এই বিষোদ্গারের ভাষা অধিকাংশ সময় সীমা ছাড়িয়ে যায়। এই আঞ্চলিক নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য দুই দেশের দীর্ঘদিনের আস্থাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পালাবদল বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়; বরং এটি আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ও বাস্তববাদী কূটনীতির দাবি রাখে। আমাদের বুঝতে হবে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশ ইস্যুকে পরিকল্পিতভাবে একটি রাজনৈতিক পণ্য বানানো হয়েছে। এই বাস্তবতায় আবেগের বশবর্তী না হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। আমাদের জাতীয় সংহতি ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানই পারে বাইরের যেকোনো ষড়যন্ত্র বা চাপকে নস্যাৎ করতে। সীমান্তের ওপারে গেরুয়া পতাকা উড়ুক বা না উড়ুক, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষায় আমাদের নিজেদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে হবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা নিজেদের ঘরে শান্তি ও ঐক্য বজায় রাখতে পারে, বাইরের কোনো শক্তি তাদের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হতে পারে না। সীমান্তের এপার-ওপারে বাড়তে থাকা এই উদ্বেগ আমাদের জন্য তাই এক নতুন বাস্তবতার বার্তা। বদলে যাওয়া বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এই সমীকরণে টিকে থাকতে হলে আবেগ নয়, প্রয়োজন দূরদর্শী কূটনীতি, জাতীয় ঐক্য এবং আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রচিন্তা।









