২০২৬–২৭ অর্থ বছরের বাজেট: বাজেট আসলে কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশে ২০২৬–২৭ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেট সামনে রেখে আবারও আলোচনায় এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক পরিকল্পনা। এই বাজেট শুধু সরকারের আয়–ব্যয়ের হিসাবনয়, বরং এটি এমন একটি নথি যা দেশের অর্থনীতির দিকনির্দেশনা ঠিক করে দেয়।
সাধারণ মানুষের জীবনে বাজেটের প্রভাব অনেক গভীর। বাজারে চাল–ডালের দাম থেকে শুরু করে রাস্তা, হাসপাতাল, স্কুল—সবকিছুই বাজেটের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু অনেকের কাছেই বাজেট এখনো জটিল ওদূরের বিষয় মনে হয়।
আসলে বাজেট হলো সরকারের একটি পরিকল্পনা, যেখানে ঠিক করা হয়—কত টাকা আয় হবে, কোথা থেকে আসবে, এবং কোথায় কীভাবে খরচ হবে।
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ এবংকর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জের মধ্যে আসন্ন বাজেটকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বাজেটে উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা থাকবে।
বাজেটকী?
বাজেটহলো একটি দেশের নির্দিষ্ট অর্থ বছরের আয় ও ব্যয়ের পরিকল্পনা।
সরকার কোথা থেকে কত টাকা আয় করবে এবং সেই টাকা কোথায় কীভাবে খরচ করবে—এই সবকিছুই বাজেটে নির্ধারণ করা হয়।
সরকারএই টাকা ব্যয় করে—
- সরকারিকর্মচারীদের বেতন
- রাস্তাও সেতু নির্মাণ
- শিক্ষাও স্বাস্থ্য খাত
- নিরাপত্তাও প্রশাসন
ব্যক্তিগত বাজেট ও জাতীয় বাজেট কি একই?
না, এক নয়।
একজন মানুষ সাধারণত আগে আয় দেখে, তারপর খরচ করে। কিন্তু সরকার আগে ঠিক করে কত খরচ করতে হবে, তারপর সেই অনুযায়ী আয়সংগ্রহ করে।
মূল পার্থক্যগুলো হলো—
- ব্যক্তি নিজের বা পরিবারের জন্য বাজেট করেন, সরকার দেশের জন্য করে
- ব্যক্তির বাজেট দৈনিক, মাসিক বা বার্ষিক হতেপারে, কিন্তু জাতীয় বাজেট এক বছরের জন্য
- ব্যক্তি ঋণ নিলে তা ব্যক্তিগতভাবে শোধ করেন, সরকার দেশ ও প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়
- ব্যক্তি দেউলিয়া হতে পারেন, কিন্তুরাষ্ট্র একইভাবে দেউলিয়া হয় না
সরকারের আয় কোথা থেকে আসে?
সরকারের প্রধান আয় আসে কর থেকে।
এগুলোদুই ধরনের—
- প্রত্যক্ষকর: আয়কর, কোম্পানি কর, সম্পত্তি কর
- পরোক্ষকর: ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, অন্যান্য শুল্ক
এছাড়াসরকার আয় করে—
- রাষ্ট্রীয়প্রতিষ্ঠান থেকে
- জরিমানাও ফি থেকে
- টোলও ভাড়া থেকে
বাজেটেরধরন
বাজেটসাধারণত তিন ধরনের হয়—
- সুষমবাজেট: আয় ও ব্যয়সমান
- ঘাটতিবাজেট: ব্যয় বেশি, আয়কম
- উদ্বৃত্তবাজেট: আয় বেশি, ব্যয়কম
বাংলাদেশেসাধারণত ঘাটতি বাজেট করা হয়, কারণব্যয় বেশি এবং আয়কম।
- ঘাটতিপূরণ করে কীভাবে?
- সরকারঘাটতি পূরণ করে ঋণনিয়ে।
ঋণআসে দুই জায়গা থেকে—
- দেশেরভেতরের ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র
- বিদেশিদেশ ও সংস্থা
কখনোকখনো সরকার টাকা ছাপিয়েও ঘাটতিপূরণ করে। এতে বাজারেটাকার পরিমাণ বেড়ে যায় এবংদাম বাড়ে।
সরকারকোথায় খরচ করে?
সরকারেরব্যয় দুই ধরনের—
১. রাজস্ব বা চলতি ব্যয়
এখানেথাকে—
- প্রশাসনচালানো
- নিরাপত্তা
- বেতনও ভাতা
- সামাজিকসুরক্ষা কর্মসূচি
২. উন্নয়ন ব্যয়
- এখানেথাকে—
- রাস্তাও সেতু
- বিদ্যুৎও পানি
- স্কুলও হাসপাতাল
- বড়বড় উন্নয়ন প্রকল্প
বাজেটপেশ ও ফাইন্যান্স বিল
বাজেটপ্রক্রিয়া সংসদে নির্দিষ্ট নিয়মে হয়—
- অর্থমন্ত্রীসংসদে বাজেট উপস্থাপন করেন এবং বিস্তারিতবক্তব্য দেন
- এরপরবাজেট নিয়ে সাধারণ আলোচনাহয়, যেখানে সংসদ সদস্যরা মতামতদেন
- আলোচনারশেষে অর্থমন্ত্রী আবার বক্তব্য দেনএবং সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন
- এরপরতিনি ফাইন্যান্স বিল (Finance Bill) উত্থাপন করেন, যেখানে কর ও শুল্কেরপ্রস্তাব থাকে
- এইবিল সাধারণ বিলের মতো হলেও এটিসাধারণত কোনো কমিটিতে পাঠানোহয় না
- এইফাইন্যান্স বিলই বাজেটের কর–সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে আইনে পরিণত করে।
ঘাটতিবাজেট কি খারাপ?
সবসময় নয়।
অর্থনীতিবিদদেরমতে, উন্নয়নশীল দেশে নিয়ন্ত্রিত ঘাটতিবাজেট অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্যকরে। তবে বেশি ঘাটতিহলে ঋণ বাড়ে এবংচাপ তৈরি হয়।
সাধারণমানুষের জন্য বাজেট কেনগুরুত্বপূর্ণ?
বাজেটসরাসরি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। তাই সাধারণ মানুষেরনজর রাখা দরকার—
- নিত্যপণ্যেরদাম বাড়বে কি না
- নতুনকর আসছে কি না
- চাকরিও কর্মসংস্থান বাড়বে কি না
- শিক্ষাও স্বাস্থ্য খাতে খরচ বাড়ছেকি না
- করমুক্তআয়ের সীমা পরিবর্তন হচ্ছেকি না
- এলাকায়উন্নয়ন প্রকল্প আসছে কি না
- সরকারকত ঋণ নিচ্ছে
- বাজেটকতটা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে
শেষকথা
বাজেটশুধু হিসাবের খাতা নয়। এটিএকটি দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
এইপরিকল্পনার মাধ্যমে ঠিক হয়—কীভাবেদেশ চলবে, কীভাবে উন্নয়ন হবে, এবং সাধারণমানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আসবে।









