সরকার ও অপরাধে চাপা পরেছে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রম

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সরকারে বিলিন হওয়া যেন অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নানা পরিবর্তনের আশা করা হলেও কোনো কিছুই যে পরিবর্তন হয়নি এটি তার অন্যতম প্রমাণ। ফলে অতীতের ধারাবাহিকতায় ১৭ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রমও সরকারের কর্মসূচিতে চাপা পরেছে।
এপ্রিল মাসজুড়ে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রম ছিল এক ধরনের পুনর্গঠন, প্রশাসনিক ব্যস্ততা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর দলটি রাষ্ট্র পরিচালনায় মনোযোগী হলেও মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতা তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান ছিল।
ফেব্রুয়ারিতে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় ফিরে আসে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সাংবিধানিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রশাসনিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার কাজ শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় এপ্রিল মাসে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সক্রিয় থাকলেও দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। বিপরীতে দলীয় নেতাকর্মীদের নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পরা সরকার ও দলকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে।
মাসজুড়ে সরকরের কার্যক্রমই দলীয় কর্মসূচি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বিএনপির চেয়াম্যান তারেক রহমান। মন্ত্রীসভায় স্থান পেয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতারা। ফলে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপালনে ব্যস্ত নেতারা দলীয় কমর্সূচিতে কমই অংশ নেন। আবার রাষ্ট্রীয় প্রটোকল মেনে তারা যেসব কর্মসূচিতে অংশ নেন তা দলীয় কম, রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে রুপ নেয়।
এপ্রিল মাসজুড়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির দৃশ্যমান কার্যক্রম বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল একমাত্র সুস্পষ্ট দলীয় সাংগঠনিক কর্মসূচি। বাকি অধিকাংশ কার্যক্রমই ছিল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগনির্ভর বা সরকারকেন্দ্রিক। ১০ এপ্রিল কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংরক্ষিত আসনের জন্য মনোনয়ন ফরম বিতরণ শুরু হয় এবং ২০-২১ এপ্রিল মনোনয়ন জমা গ্রহণ করা হয়। যেখানে নারী নেত্রীরা সরাসরি দলীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।
এর বাইরে মাসজুড়ে যেসব কার্যক্রম সামনে এসেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই সরকার পরিচালনা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ১৩ ও ১৪ এপ্রিল ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সময়ে টাঙ্গাইলে কৃষক সমাবেশ, কৃষি মেলা উদ্বোধন এবং কৃষকদের উদ্দেশে নীতিনির্ধারণী বক্তব্য প্রদান করেন। যা মূলত সরকারের কৃষিনীতির অংশ হিসেবে উপস্থাপিত।
১৮ এপ্রিল সরকার গঠনের দুই মাস পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সরকারের অর্জন, নীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়, যা রাজনৈতিক বার্তা বহন করলেও প্রকৃতপক্ষে ছিল প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম। এছাড়া মাসের শুরুতে ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্য পাওয়া একটি দলকে অভিনন্দন জানানোর মতো উদ্যোগও ছিল রাষ্ট্রীয় প্রটোকলভিত্তিক।
এ সময় বিএনপির অন্য শীর্ষ নেতারাও নানাবিধ কর্মসূচিতে অংশ নেন। তবে তারা দলের নেতা হিসেবে নয় অধিকাংশ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন সরকারের মন্ত্রী হিসেবে। সার্বিকভাবে দেখা যায়, এপ্রিল মাসে বিএনপির কার্যক্রমে দলীয় রাজনৈতিক তৎপরতার চেয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
নানাবিধ অপরাধে জড়িয়েছে নেতাকর্মীরা
এপ্রিল মাসজুড়ে দলীয় ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নানাবিধ অপরাধমূলক কাজ বারবার গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। যা দল হিসেবে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। এ সময়ে অনেক নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিস্কারও করেছে বিএনপি। তবে শীর্ষ নেতাদের বারবার সতর্কবর্তা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাতেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায়নি।
দেশের মূলধারার গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র এপ্রিল মাসেই বিএনপি ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ৪০টি চাঁদাবাজীর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দলের নাম বারবার উঠে এসেছে।
এ সময়ে বিএনপি সরকার প্রণীত ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণসহ মোট ৯টি ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে। এসব ঘটনায় দলের নেতাকর্মী ছাড়াও নেতাদের সন্তানদের নামও উঠে এসেছে। এপ্রিল জুড়ে অন্তত ৭৮টি সংঘর্ষে জড়িয়েছে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে বিরোধীদল জামায়াতসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলের সাথে কয়েকটি সংঘর্ষ হলেও অধিকাংশেই আন্তঃকোন্দলের ফলে হয়েছে।
এসব সংঘর্ষ ও অন্যান্য ঘটনায় বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ৯টি হত্যার অভিযোগ গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এছাড়া দখল, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, হুমকিসহ নানা অভিযোগের তথ্য ছিল মূলধারার গণমাধ্যমে।
তবে এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ২৩ এপ্রিল সন্ধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়া এক ভূয়া স্কিনশটকে কেন্দ্র করে সেদিন শাহবাগ থানায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা মুখোমুখী অবস্থান নেয়। এ সময় শাহবাগ থানার ভেতর ছাত্রদলের হামলার শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের দুই নেতা এবি জোবায়ের ও মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদ। এ সময় কয়েক দফা হামলায় অন্তত ১৬ সাংবাদিক আহত হন।
এমএইচ/









