ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দেশের অর্থনীতির মন্দাভাব নিয়ে চাপে রয়েছে নতুন সরকার। একদিকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে নতুন করে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও এর কঠোর শর্তাবলি নিয়ে অর্থনৈতিক অঙ্গনে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশেষ করে মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনা বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এ অবস্থায় বিএনপি তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিতর্কিত নেতাদের বিরুদ্ধে ‘শুদ্ধি অভিযান’ ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করছে। তবে বিরোধীদলের দিক থেকে অনেকটাই স্বস্তিতে সরকার। জুলাই সনদসহ কিছু ইস্যুতে বিরোধী জোট সোচ্চার থাকলেও সরকার বিরোধী কঠোর অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। তবে জুলাই হত্যাকাণ্ড, বিগত আওয়ামীলীগ আমলে গুম-খুনের বিচারের পাশাপাশি হেফাজতে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে নতুন করে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনার বিচার এবং নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি করা হয়েছে। বুধবারের (৬ এপ্রিল) আলোচিত ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার, বিরোধী শক্তি এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলো ভিন্ন ভিন্ন বার্তা নিয়ে মাঠে সক্রিয় থাকলেও তাদের কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিলছে সংস্কার, নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে। অর্থনীতি ও আইএমএফ: ঋণের জালে নতুন চাপ দিনের শুরুতেই আলোচনায় আসে আইএমএফের কাছে নতুন করে ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাওয়ার বিষয়টি। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ওয়াশিংটনে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার আভাস দিলেও বিশ্লেষকরা বলছেন পরিস্থিতি মোটেও সহজ নয়। চলমান ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তির ১৩০ কোটি ডলারে জট লেগে আছে। জুনে আইএমএফ প্রতিনিধি দল আসার আগে সরকার বাজেট সংস্কারের মাধ্যমে তাদের সন্তুষ্ট করতে চায়। ফলে জ্বালানি ব্যয় মেটাতে এই ঋণ চাওয়া হলেও এর বিনিময়ে ভর্তুকি কমানো ও কর বাড়ানোর মতো শর্তগুলো সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি করবে বলে সতর্ক করছে অর্থনীতিবিদরা। যা সরকারের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে বড় চ্যালেঞ্জ। মিরপুরে চাঁদাবাজি: পুলিশের তালিকায় বিএনপির অস্বস্তি রাজধানীর মিরপুর অঞ্চলে ‘মিলেমিশে চাঁদাবাজি’ নিয়ে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ডিএমপির তালিকায় মিরপুরের সাতটি থানায় ৭২ জন চাঁদাবাজ ও ২৫ জন আশ্রয়দাতার নাম উঠে এসেছে, যাদের বেশিরভাগই বিএনপির স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শুধু মিরপুর ১০ নম্বর থেকে ১৩ নম্বর পর্যন্ত ফুটপাত থেকেই মাসে অন্তত ৯০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে। এই টাকার ভাগ পুলিশের অসাধু কর্মকর্তাদের কাছেও যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দলের নাম ভাঙিয়ে এই অপতৎপরতা বিএনপির জন্য বড় অস্বস্তি তৈরি করেছে, যা সরকারের ‘সুশাসন’ এর বার্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিতর্কিতদের নিয়ে ‘হার্ডলাইন’ ও শুদ্ধি অভিযানের চিন্তা বিএনপির দল ও সরকারকে বিতর্কমুক্ত রাখতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। গত দুই মাসে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৩ জন নিহতের ঘটনায় দলটি এখন দিশেহারা। এ অবস্থায় গত ১ মে শ্রমিক দলের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, অন্যায়ের সঙ্গে জড়িতদের ‘টপ টু বটম’ কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। জানা গেছে, ঈদুল আযহার পরপরই কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগে সারাদেশে বিতর্কিত ও হাইব্রিড নেতাদের সরিয়ে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের সামনে আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। শাপলা গণহত্যার বিচার ও শাহাবাগপন্থীদের সক্রিয়তা ৫ মে শাপলা চত্বরের এক যুগ পূর্তিতে রাজধানীসহ সারাদেশে ফের এই নৃশংসতার বিচারের দাবি উঠেছে। হেফাজতে ইসলাম ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভিন্ন ভিন্ন আয়োজনে তাদের দাবি পেশ করেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শাহবাগপন্থী গণহত্যা সমর্থনকারীদেরও সক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ‘হত্যাযোগ্য’ নানা বয়ান তুলে ধরতে দেখা গেছে তাদের। এদিকে শাপলা চত্বরের গণহত্যাকে জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং নিহতদের ক্ষতিপূরণসহ ৫ দফা দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। অপর এক অনুষ্ঠানে এনসিপি সদস্য সচিব আখতার হোসেন ৫ মে-র নিহতদের ‘রাষ্ট্রীয় শহীদের’ মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে শাহবাগপন্থীদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য সিনিয়র সাংবাদিক সাবির মুস্তাফা। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের অভিযানে কোনো মৃত্যু বা হত্যাযজ্ঞ ঘটেনি মর্মে বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফার করা দাবিগুলোকে 'দ্য ডিসেন্ট'-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাবির মুস্তাফা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দাবি করেছিলেন যে ওই রাতে কোনো 'লাইভ ফায়ারিং' হয়নি এবং মানবাধিকার সংস্থা 'অধিকার' বা 'হিউম্যান রাইটস ওয়াচ'-এর তালিকায় ওই রাতের অভিযানে নিহত কেউ নেই; তবে সমসাময়িক সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে অভিযানে শিশু-কিশোরসহ একাধিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। সাবির মুস্তাফার এই ভিত্তিহীন বক্তব্যগুলোকে বর্তমানে রাজনৈতিক স্বার্থে অপব্যবহার করা হচ্ছে, অথচ সে সময় ঘটনাস্থলে থাকা বিবিসির নিজস্ব সংবাদদাতা কাদির কল্লোলও সাবিরের এমন দাবির দায়ভার গ্রহণ করেননি। নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপি সরকার প্রশাসনিক ও দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভাবমূর্তি সংকট কাটানোর চেষ্টা করছে। তবে আইএমএফের কঠিন শর্ত এবং মাঠপর্যায়ে নিজের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, ধর্মীয় ও নতুন রাজনৈতিক দলগুলো ঐতিহাসিক আবেগকে কাজে লাগিয়ে জনসমর্থন সংহত করার কৌশলে এগোচ্ছে।