ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বর। ২০১৩ সালের ৫ মে দিবাগত রাত। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ২টা ১৫ মিনিট। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক এলাকাটি তখন হাজার হাজার মানুষের অবস্থানে পরিণত হয়েছিল। হেফাজতে ইসলাম ঘোষিত সমাবেশে অংশ নেওয়া মানুষদের অনেকেই ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে ছিলেন, কেউ ইবাদতে মগ্ন ছিলেন, কেউবা ভোর হলে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় হঠাৎ করে নিভিয়ে দেওয়া হয় পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ। চারপাশ নিমিষেই অন্ধকারে ঢেকে যায়।
অন্ধকার নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় যৌথ বাহিনীর অভিযান। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চারদিক থেকে এগিয়ে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেটের পাশাপাশি তাজা গুলিও ছোড়া হয়। মুহূর্তেই মতিঝিল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে চিৎকার, আর্তনাদ, দৌড়ঝাঁপ আর রক্তাক্ত মানুষের শরীর।
সেই রাতের পর কেটে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু যাদের পরিবার থেকে একজন মানুষ আর কখনও ফিরে আসেননি, তাদের জীবনে সময় যেন থমকে আছে ২০১৩ সালের ৫ মে রাতেই। রাষ্ট্র এখনও প্রকৃত নিহতের সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারেনি। বিচার হয়নি। বরং দীর্ঘদিন ঘটনাটিকে অস্বীকার, আড়াল এবং ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অভিযোগ রয়েছে।
শাপলা গণহত্যা দিবসে আমরা কথা বলেছি কয়েকটি শহীদ পরিবারের সদস্য, আহত প্রত্যক্ষদর্শী এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে এক দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস, যা শুধু স্বজন হারানোর নয়—বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক ধ্বংসের গল্পও।
বৃদ্ধ বাবার কাঁধে সংসারের বোঝা
শহীদ আবু হানিফ ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুর পর পুরো পরিবার যেন গভীর খাদে পড়ে যায়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, হানিফের বাবা এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তবুও সংসার চালাতে তাকে নদীতে বালি উত্তোলনের ট্রলারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হয়। প্রতিদিন অনিশ্চয়তা নিয়ে কাজ করেন তিনি।
আব্দুল হামিদ নামক হানিফের পরিবারের এক স্বজন বলেন, “হানিফের পরিবার খুবই দুঃখ-কষ্টের মধ্যে আছে। তার বাবা বয়স্ক মানুষ, এই বয়সে নামাজ পড়ে ঘরে থাকার কথা, তিনি এখন পেটের দায়ে নদীতে শ্রম দিচ্ছেন। ছেলে হারানোর কষ্ট তো আছেই, তার সঙ্গে দারিদ্র্য তাকে আরও ভেঙে দিয়েছে।”
হানিফের মা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার সামর্থ্য নেই পরিবারের। তাদের বসতঘরও ভেঙে পড়ার উপক্রম। আব্দুল হামিদ বলেন, “সরকারের উচিত এই অসহায় পরিবারগুলোর জন্য কিছু করা। কারণ, এই হত্যাকাণ্ডের দায় তো সাবেক সরকারেরই।”
শাহ আলমের মায়ের চোখে এখনও অপেক্ষা
শহীদ শাহ আলমের মা এখন ৮৫ বছরের বেশি বয়সী। বয়সের ভার, শারীরিক অসুস্থতা আর ছেলেহারা কষ্ট তাকে প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছে।
পরিবার সূত্র জানায়, তিনি এখনও অনেক সময় ছেলের কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার একমাত্র মেয়ে নিজের সংসার সামলিয়ে মাকে দেখভালের চেষ্টা করছেন।
শাহ আলমের বোন বলেন, “মা এখনও মনে করেন ভাই দরজা খুলে একদিন ফিরে আসবে। এই অপেক্ষা আমাদের আরও কষ্ট দেয়।”
তিনি বলেন, “শাহ আলম ছিলো আমাদের খুবই আদরের ভাই। অথচ তার মৃত্যুর পর আমরা মুখ খুলে কিছু বলতেও পারিনি। বুকফাটা কান্না ভেতরেই জমিয়ে রেখেছি। আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের বিচার হলেই আমদের মন শান্ত হবে।”
স্ত্রী-সন্তানকে ঘরছাড়া করা হয়
শহীদ নিজামুল হকের মৃত্যুর পর তার পরিবার শুধু আর্থিক সংকটে পড়েনি, সামাজিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, স্বজনদের একটি অংশ তার স্ত্রী ও সন্তানকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। পরে বাধ্য হয়ে তারা মেয়ের বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন।
তার স্ত্রী পারভীন আক্তার বলেন, “স্বামী হারানোর পর ভেবেছিলাম অন্তত পরিবার পাশে থাকবে। কিন্তু উল্টো আমাদের বের করে দেওয়া হয়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিদিন আতঙ্কে থাকি।”
মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি দুর্ভোগ
শহীদ ফারহান রাজা গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও তার পরিবার অভিযোগ করে, যথাসময়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি।
পরিবারের দাবি, বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা ও অবহেলার কারণে তারা চরম ভোগান্তির শিকার হয়। এমনকি মরদেহ বুঝে পেতেও কয়েক লাখ টাকা খরচ করতে হয়।
শরিফুল ইসলাম নামক ফারহানের এক স্বজন বলেন, “আমরা মানুষটাকে হারিয়েছি, তারপরও যেন প্রতিটি ধাপে আমাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই শাপলা হত্যাকাণ্ডে শহীদ ফারহানদের রাষ্ট্র স্মরণ করুক, অসহায় পরিবারগুলোর জন্য রাষ্ট্র কিছু করুক। তারও আগে সেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ দায়ীদের ফাঁসি হোক।”
পাঁচ সন্তান নিয়ে সংগ্রাম
মোয়াজ্জেমুল হক নান্নুর পরিবারে এখনো সংকট কাটেনি। তিন মেয়ে ও দুই ছেলের পরিবারটি মূল অভিভাবক হারিয়ে দিশাহীন হয়ে পড়ে। বড় মেয়ে স্বামী হারিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে এসেছেন। ছোট ছেলে এখনও পড়াশোনা করছে।
নান্নুর স্ত্রী আয়েশা আক্তার বলেন, “একজন বাবার অনুপস্থিতি শুধু অর্থের সমস্যা তৈরি করে না, পুরো পরিবারকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। আমরা কীভাবে বেঁচে আছি একমাত্র আল্লাহ তায়ালা জানেন।”
একই পরিস্থিতি শহীদ সালাউদ্দিনের পরিবারেও। তার মা এখন প্রায় নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন। বয়সজনিত অসুস্থতা তাকে কাবু করে ফেলেছে। স্থানীয়রা জানান, তিনি প্রায়ই ছেলের কথা মনে করে কান্না করেন।
আহত কিশোরের বিভীষিকাময় স্মৃতি
মুফতী রাশেদুল ইসলাম সিরাজী তখন ছিলেন কিশোর। তিনি বলেন, “আমি মাত্র ১৩-১৪ বছরের ছিলাম। শাপলায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ গুলির শব্দ, মানুষ দৌড়াচ্ছে, কেউ পড়ে যাচ্ছে। একসময় দেখি আমার ডান পা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। পরে জানতে পারি আমি পা হারিয়েছি। আমার শরীরের অংশ এখনও শাপলার মাটিতে পড়ে আছে।”
তিনি বলেন, “শাপলা হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর হয়েছে, সেই স্বৈরাচার খুনি হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। এবার আমরা কড়ায়গণ্ডায় আমাদের হিসাব বুঝে নিতে চাই। আমরা চাই বর্তমান সরকার যেন অবিলম্বে হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ হত্যাকাণ্ডের সকল নায়কদের বিচারের মুখোমুখি করুক। অন্যথায় বিচারের দাবিতে আমরা আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হবো।”
অস্বীকারের রাজনীতি
অভিযানের পর তৎকালীন সরকার ধারাবাহিকভাবে দাবি করে, সেখানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
জাতীয় সংসদে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, মানুষ “মৃত সেজে ছিল”।
সরকারের অন্য মন্ত্রীদের বক্তব্যেও একই সুর ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অভিযানকে “সফল” ও “রক্তপাতহীন” দাবি করে।
মৃত্যু সংখ্যা এখনও রহস্য
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ৬১ জন নিহতের তালিকা প্রকাশ করে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অন্তত ৫৮ জন নিহতের তথ্য দেয়।
অন্যদিকে বেওয়ারিশ লাশ দাফনের হিসাবেও অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়।
তবুও রাষ্ট্রীয়ভাবে এখন পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়নি।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নতুন করে বিচার আশা করছে। তাদের দাবি, স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন, প্রকৃত নিহতের তালিকা প্রকাশ এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হোক।
টিআই/
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় ইসলামী ছাত্রসংঘের তৎকালীন নেতা আব্দুল মালেকের ছবি যুক্ত হওয়ার পর তাঁকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। প্রতিবেদনে আব্দুল মালেকের পরিচয়, ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষানীতি নিয়ে একটি আলোচনা সভাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং তাঁর মৃত্যুর ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী ছাত্রসংঘের পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ১৯৭১ সালে সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের ভূমিকার বিষয়ও প্রতিবেদনে এসেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতাসীন বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতার পাশাপাশি আগস্ট মাস জুড়ে দলটির নেতাকর্মীদের ঘিরে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনা সামনে এসেছে। চাঁদাবাজি, মাদক, সংঘর্ষ, হামলা, দখল, অস্ত্র প্রদর্শন ও সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণের মতো অভিযোগে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় কোথাও স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও দলীয়ভাবে বহিষ্কার, অব্যাহতি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।