ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরের সেই রাত—২০১৩ সালের ৫ মে দিবাগত রাত। আলো নিভে যাওয়া রাজধানী, চারদিকে গুলির শব্দ, সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণ, মানুষের ছুটোছুটি আর আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া জনতা। এক যুগ পেরিয়ে গেলেও সেই বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়ায় অনেক প্রত্যক্ষদর্শীকে। শাপলা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পূর্তিতে নিজের সেই রাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ। সোমবার (৫ মে) দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি দাবি করেন, অভিযানের সময় খুব কাছ থেকে পুলিশ গুলি চালাতে দেখেছেন তিনি। জুনায়েদ লিখেছেন, “২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে রাতে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত হয়। বিকেলে বাসা থেকে শাপলা চত্বরের উদ্দেশ্যে বের হই। তখন রাস্তাঘাট বন্ধ, যানবাহন চলাচল বন্ধ এবং বিভিন্ন স্থানে পুলিশের তল্লাশি চলছিল।” তিনি জানান, চিটাগাং রোড থেকে আরেফিন ভাই, নাজিম ভাইসহ কয়েকজনের সঙ্গে রওনা দেন। প্রথমে তারা শানারপাড় এলাকায় অবস্থান নেন। পরে একসঙ্গে চললে পুলিশি বাধার মুখে পড়তে পারেন—এই আশঙ্কায় ভাগ হয়ে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হন। “কখনো মূল সড়ক, কখনো গলি, কখনো রিকশা আবার কখনো হেঁটে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আমরা ইত্তেফাক মোড়ে পৌঁছাই। সেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখে কিছুটা স্বস্তি পাই,”—পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নটরডেম কলেজ গেট এলাকায় অবস্থান করছেন—এমন খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান। সেখানে এশার নামাজ আদায় করেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছন থেকে বিতরণ করা মুড়ি খেয়ে রাত কাটানোর প্রস্তুতি নেন। জুনায়েদ বলেন, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযানের গুঞ্জনও বাড়তে থাকে। তিনি লেখেন, “রাত ২টার দিকে ফকিরাপুলের দিক থেকে পুলিশ ও র্যাব সাঁজোয়া যান নিয়ে আরামবাগ এলাকায় হামলা শুরু করে। সমাবেশে অংশ নেওয়া মানুষজন সেখানে ব্যারিকেড দিয়েছিল। সেই ব্যারিকেড ভেঙে রাবার বুলেট ও শটগানের গুলি চলতে থাকে।” পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মঞ্চ থেকে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থানে বসে পড়ার আহ্বান জানানো হলেও ততক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে দাবি করেন তিনি। “আমি আমার বন্ধু রাজকে নিয়ে ইডেন মসজিদের সামনে বসে পড়ি। তখন পুলিশ ও র্যাবের গাড়ি আমাদের থেকে সর্বোচ্চ ১০০ মিটার দূরে ছিল। গুলি আর সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে পুরো এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের সামনে একজন ছিল, পেছনে আমরা দুইজন। পেছনে তাকিয়ে দেখি আর কেউ নেই। সবাই দৌড়াচ্ছে।” এরপর তিনি শাপলা চত্বরের দিকে এগিয়ে যান। সেখানে গিয়ে মানুষের আতঙ্কিত ছুটোছুটি প্রত্যক্ষ করেন। “চোখের সামনে দেখেছি, কীভাবে শাপলার লোহার গ্রিল ভেঙে মানুষ পড়ে যাচ্ছিল,”—লিখেছেন জুনায়েদ। তিনি জানান, এফবিসিসিআই ভবনের নিচে গিয়ে দেখেন, সমাবেশের মঞ্চ তৈরিতে ব্যবহৃত ট্রাকগুলো দ্রুত এলাকা ত্যাগ করছে। “আমি নারায়ে তাকবীর স্লোগান দিই। মানুষকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করি। জুবায়ের কাকার সঙ্গে স্লোগান দিয়েও কাউকে থামানো যায়নি। সবাই ভয়ে নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল।” পরে বঙ্গভবনের পাশের গলিতে গিয়ে নতুন করে সংঘর্ষের মুখোমুখি হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষায়, “কয়েক হাত সামনে থেকে পুলিশ গুলি করছিল। একবার পুলিশ আমাদের ধাওয়া দেয়, আবার আমরা দলবদ্ধ হয়ে পুলিশকে ধাওয়া দিই। মানুষকে সাহস দিই, স্লোগান দিই।” তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংঘর্ষে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। “টিয়ারশেলের কারণে আমাকে চেনা যাচ্ছিল না। হাঁটুতে গুলির সামান্য আঘাতও পাই। শেষ দিকে বুঝতে পারি, আমরা কয়েকজন ছাড়া আর কারও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো মানসিক শক্তি অবশিষ্ট নেই।” জুনায়েদ দাবি করেন, ৫ মে রাতের ঘটনার পরদিন সিদ্ধিরগঞ্জের মাদানীনগর মাদ্রাসা এলাকাতেও সহিংসতার ঘটনা ঘটে, যা খুব বেশি আলোচনায় আসেনি। পোস্টের শেষাংশে তিনি শাপলা চত্বরের ঘটনার বিচার দাবি করেন। তিনি লেখেন, “অসংখ্য নিরীহ আলেম ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে হত্যার পরও কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। বরং সংসদে ঘটনাটি নিয়ে উপহাস করা হয়েছিল। সব হত্যার বিচার চাই।” উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ব্যাপক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই রাতের অভিযানে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে।