মাঠের ধুলো ওড়া পথে যখন সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়ে, তখন বাংলার আকাশে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা নামে। কিন্তু এবারের স্তব্ধতা কোনো শান্তির বার্তা নয়, বরং এক অজানা আশঙ্কার। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরিয়েছে। যে গঙ্গাপারে একসময় লাল ঝাণ্ডার জয়ধ্বনি শোনা যেত, যেখানে ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর স্লোগানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৫ বছর রাজত্ব করেছেন, সেখানে আজ উড়ছে গেরুয়া পতাকা।
এর আগে গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪টি আসনে ভোট গ্রহণ হয়। ভোটের ফলাফল বলছে, বিজেপি বড় ব্যবধানেই জিতেছে, এবং মমতা অনেকটা সূচনীয়ভাবেই হেরেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, মমতার হারের সঙ্গে সঙ্গে কি হেরে গেল এক লড়াকু যুগের স্বপ্ন? ভবানীপুরের অলিগলি থেকে মেদিনীপুরের ধানখেত, সবই আজ যেন এক নতুন সমীকরণের জালে বন্দী।
কেন ধসে পড়ল মমতার কেল্লা?
রাজনীতির পাটিগণিত সব সময় আবেগে চলে না। এবারের ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়ের পেছনে কাজ করেছে এক গভীর ও পরিকল্পিত নীলনকশা। ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনে মানুষের মধ্যে যে ক্লান্তি বা ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ তৈরি হয়েছিল, বিজেপি তাকেই সলতে পাকানোর কাজে লাগিয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে রেশন কেলেঙ্কারি কিংবা আরজি কর কাণ্ডের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো তৃণমূলের ভাবমূর্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে বিষিয়ে তুলেছিল। তবে কেবল জনরোষ নয়, বিজেপির কৌশলী চাল ছিল ভিন্ন স্তরের। এবারের নির্বাচনে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) চালানো হলো, তা কার্যত তৃণমূলের ভোটব্যাংকের কোমর ভেঙে দিয়েছে। প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ ছিল সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটার।
অভিযোগ উঠেছে, বিজেপি সচেতনভাবেই এই কৌশল প্রয়োগ করেছে, যাতে মুসলিমপ্রধান আসনগুলোতে তৃণমূল তাদের একচেটিয়া আধিপত্য হারায়।
একসময় উত্তরবঙ্গেই বিজেপির জোর ছিল বেশি। কিন্তু এবার তারা দক্ষিণবঙ্গের সেই সব গড় দখল করেছে, যেখানে তৃণমূলের কার্যত কোনো প্রতিপক্ষ ছিল না। দুই মেদিনীপুর, বীরভূম, পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়ায় বিজেপি শুধু জেতেনি, তারা কার্যত বিরোধীদের ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিয়েছে।
মমতার চিরকালীন ভরসা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ কিংবা নগদ সহায়তার রাজনীতি এবার হার মেনেছে বিজেপির কেন্দ্রীয় অনুদানভিত্তিক রাজনীতি এবং হিন্দুত্ববাদী আবেগের কাছে।
নির্বাচন কমিশনের ‘অতি সক্রিয়তা’ ও নিয়ন্ত্রিত ভোট
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আগে বলত, ‘ভোট মানেই হিংসা’। কিন্তু ২০২৬ সালের এই ভোটে হিংসার বদলে দেখা গেল এক শীতল নিয়ন্ত্রণ। নির্বাচন কমিশন এবার এমন এক ভূমিকা পালন করেছে, যা নিয়ে তর্কের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। প্রায় পৌনে তিন লাখ কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে এবং ৬৫০ জন পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে নির্বাচনের আগে সরিয়ে দিয়ে কমিশন মাঠ একেবারে পরিষ্কার করে দিয়েছিল।
তৃণমূলের অভিযোগ, এটি ছিল নির্বাচনকে কেন্দ্রীয় সরকারের কব্জায় নেওয়ার একটি পরিকল্পিত ছক।
অতীতে যে ছাপ্পা ভোট কিংবা পেশিশক্তির তৎপরতা ছিল, এবার তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। গণনাকেন্দ্রের দায়িত্বও তুলে দেওয়া হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের হাতে। মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই নির্ভয়তার আড়ালে কাজ করেছে নাগরিকত্ব হারানোর এক অদৃশ্য আতঙ্ক। বিজেপি প্রচার চালিয়েছিল ভোট না দিলে নাগরিকত্ব নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। এই ভয়ে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত ভোটার উপস্থিত হয়েছে, যার লাভ ঘরে তুলেছে বিজেপি।
ভারতীয় রাজনীতিতে ভূমিকম্প: যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংকট
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই বিজয় কেবল একটি রাজ্যের পটপরিবর্তন নয়, এটি ভারতের জাতীয় রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া একটি ঘটনা।
ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় বা ফেডারেল কাঠামোর ওপর এটি একটি বড় আঘাত। ভারতের মানচিত্রে এখন বাংলাও গেরুয়া। তামিলনাড়ু ও কেরালা ছাড়া বিজেপি এখন কার্যত অপ্রতিরোধ্য।
বিজেপির এই জয় আসলে হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের এক ধরনের বিজয়। এতদিন মনে করা হতো, বাঙালির সমন্বয়বাদী সংস্কৃতিতে হিন্দি বলয়ের হিন্দুত্ববাদ সহজে দানা বাঁধবে না। কিন্তু এবারের ফল প্রমাণ করল, সেই ‘সমন্বয়বাদ’ একপেশে মেরুকরণের কাছে পরাজিত হয়েছে।
বিজেপির এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ‘সবাইকে একই ছাঁচে ফেলা’র সংস্কৃতি এখন বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিপরীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতলে তিনি হতে পারতেন দিল্লির মোদিবিরোধী জোটের প্রধান মুখ। কিন্তু এই পরাজয় তৃণমূলকে অস্তিত্বসংকটে ফেলে দিয়েছে।
বামপন্থীদের মতো শক্ত আদর্শিক ভিত্তি তৃণমূলের নেই। তাই ক্ষমতার বাইরে যাওয়ার পর দলটির কর্মীরা যেভাবে বিজেপির দিকে ভিড়তে শুরু করেছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে তৃণমূলের অস্তিত্ব কেবল সাইনবোর্ডে টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
বাংলাদেশ কি তবে বিপাকে?
প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পালাবদল বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির নয়। এই অংশে আমাদের আরও গভীরে তাকাতে হবে। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, বিজেপির এই উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
বিজেপির প্রচারণার একটি বড় অংশ ছিল ‘অনুপ্রবেশকারী’ এবং ‘রোহিঙ্গা’ ইস্যু। অমিত শাহ কোচবিহারে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন, তারা অনুপ্রবেশকারীদের বাংলার মাটি থেকে সরিয়ে দেবেন। এই ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা মূলত সীমান্তসংলগ্ন মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো হয়।
বিজেপির এই জয় এখন এনআরসি এবং সিএএ কার্যকর করার পথ আরও সুগম করল। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের ওপর। যদি লক্ষ লক্ষ মানুষকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে পুশব্যাক করার চেষ্টা করা হয়, তবে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় একটি মানবিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একরোখা অবস্থান বাংলাদেশের জন্য সমস্যার কারণ ছিল। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সেই সমস্যার সমাধান হবে কি? উত্তর সম্ভবত নেতিবাচক। কারণ, বিজেপির রাজনীতি জাতীয় স্বার্থের চেয়েও বেশি আবর্তিত হয় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ওপর। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের বদলে ‘হিন্দুত্ববাদী সংহতি’র কথা বেশি বলবে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির এই উগ্রবাদী উত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপরও পরোক্ষ চাপ তৈরি করতে পারে। ভারতের মাটিতে যখন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কোণঠাসা হয়, তখন তার রেশ সীমান্ত পেরিয়ে এই প্রান্তেও এসে লাগে।
বিজেপি যে ‘বাঙালি জাত্যাভিমান’কে হারিয়ে ‘হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রতিষ্ঠা করল, তা কেবল বাংলার জন্য নয়, গোটা উপমহাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্যও একটি অশনিসংকেত।
রাজনীতির ধূসর ভবিষ্যৎ
পশ্চিমবঙ্গের এই জয় বিজেপির জন্য এক তিলক হলেও, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জন্য এটি এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার যে মডেল এখানে সফল হলো, তা ভবিষ্যতে ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও প্রয়োগ করা হতে পারে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এক ধরনের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার এই সংস্কৃতি প্রজাতন্ত্রের ভিত্তিকেই আঘাত করছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো লড়াই করবেন, কিন্তু তাঁর পায়ের তলার মাটি এখন আলগা। তিনি চেয়েছিলেন ‘বাঙালি জাত্যাভিমান’ দিয়ে বহিরাগত আগ্রাসন ঠেকাতে। কিন্তু দেখা গেল, বাঙালি ভোটাররা জাত্যাভিমানের চেয়ে ধর্মীয় পরিচয় এবং কেন্দ্রীয় শক্তির প্রতিশ্রুতিতেই বেশি আকৃষ্ট হয়েছে।
শহরের রাস্তাগুলো এখন গেরুয়া আবিরে ঢাকা। ঢোল-কাঁসর বাজিয়ে বিজয় উৎসব চলছে। কিন্তু সেই উৎসবের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে বহু মানুষের কান্নার শব্দ। সেই মানুষগুলো, যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে গেছে। সেই মানুষগুলো, যারা এই মাটিতে জন্ম নিয়েও আজ নিজেদের নাগরিকত্ব নিয়ে শঙ্কিত।
মোদ্দা কথা হলো, পশ্চিমবঙ্গের এই পরিবর্তন ভারতের রাজনৈতিক বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করার পথে এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদ এখন আর কেবল হিন্দি বলয়ের বিষয় নয়; তা এখন বাঙালির সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ার লাইসেন্স পেয়ে গেছে। আর এর আঁচ থেকে প্রতিবেশী বাংলাদেশও মুক্ত থাকতে পারবে না।
গঙ্গা আর পদ্মা _দুই কূলেই এখন মেঘ জমছে। এই মেঘ থেকে বৃষ্টি হবে, নাকি ঝড় উঠবে _তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান হলো এবং সেই নতুন যুগে উগ্রবাদের চাষাবাদের প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হলো।
যে বাংলা একদিন ভারতকে পথ দেখিয়েছিল, সেই বাংলা আজ কি নিজেই পথ হারাল? ঘুরে ঘুরে দেখলে হয়তো দেখা যেত, প্রান্তিক মানুষের চোখে এখন শুধুই শূন্যতা। গেরুয়া আবিরের ভিড়ে সেই শূন্যতাকে দেখার সময় এখন কারও নেই। পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনে বিজেপির জয় আসলে রাজনীতির এক নিষ্ঠুর পরিহাস।
যেখানে গণতন্ত্রের নামে ভোটারদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে পুঁজি করে ক্ষমতার মসনদ দখল করা হয়েছে। ভারতের মতো একটি বিশাল গণতান্ত্রিক দেশের জন্য এই ফলাফল এক গভীর অন্ধকারের সংকেত। আর বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। সীমান্তের ওপারে এখন যে হাওয়া বইছে, তা বন্ধুত্বের নয়, বরং উগ্র জাতীয়তাবাদের রুক্ষ বাতাস। এই বাতাস থেকে নিজেদের ঘর বাঁচানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
পশ্চিমবঙ্গের আকাশ আজ বড় বিষণ্ণ। মাঠের ধুলো ওড়া পথে আর কেউ বাউল গান গায় না, বরং ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানের কর্কশ শব্দে কান পাতাই দায়।
পশ্চিমবঙ্গের এই দিনবদল সত্যিই উন্নয়ন আনবে, নাকি কেবল একপাক্ষিক শাসনের জাঁতাকলে সাধারণ মানুষকে পিষ্ট করবে—সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আগামী পাঁচ বছরে স্পষ্ট হবে।
কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে, পরাজয় কেবল মমতার নয়; পরাজয় হয়েছে বাংলার দীর্ঘদিনের লালিত অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যেরও। পদ্মার ওপার থেকে আমরা আপাতত শুধু দীর্ঘশ্বাসই ফেলতে পারি।
বরিশাল বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ফলাফল দলটির জন্য বড় ধাক্কা। ২১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে জয় এসেছে মাত্র দুটিতে, পরাজয় ১৯টিতে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জামায়াতের জাতীয় পর্যায়ে যে অবস্থান তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বরিশালের এই ফলাফল বেশ বেমানান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে -বরিশালে সমস্যাটা আসলে কোথায়?
রাজনীতিতে পতনেরও একটি ভাষা আছে। কেউ ক্ষমতা হারান, কেউ দল হারান, কেউ জনসমর্থন হারান। আবার কেউ কেউ এতটাই সবকিছু হারান যে শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলতে হয় তৃতীয় কোনো দেশের মাটি থেকে। শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান অনেকটা তেমনই। একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে যার বিকল্প কল্পনা করাটাই ছিল প্রায় অপরাধের শামিল, আজ সেই শেখ হাসিনাকেই নিজের অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন, সে প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। একসময় যিনি বলতেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো সহজ নয়, আজ তার নিজের দেশে ফেরাই অনিশ্চিত। একসময় যিনি বিরোধীদের রাজনীতি করার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলতেন, আজ তিনি নিজেই অন্য একটি দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার নিজের পিঠ চাপড়াতে পারে। তবে এই আনন্দের অন্তরালে জমা হচ্ছে একটা গোটা দেশের হাহাকার। দীর্ঘ ১১ বছর পর এই বেতন কাঠামো এলো। ২০টি গ্রেডে থাকা প্রায় ২৪ লাখ সরকারি ও সামরিক কর্মী এবং সাড়ে ৯ লাখ পেনশনভোগী এর সুফল পাবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের বাকি সাড়ে ষোলো কোটি মানুষের কী হবে?
বছর ঘুরে আবার এসেছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি ফিরে এসেছে, কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয়নি। আড়াই শতাধিক পরিবার এখনো জানে না, তাদের স্বজন কোথায়। কেউ বছরের পর বছর ধরে ফিরে আসার অপেক্ষায়, কেউ আবার জানেনই না প্রিয় মানুষটির কী হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে গুম ছিল বিরোধী মত দমনের অন্যতম ভয়ংকর হাতিয়ার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বা সাদা পোশাকে মানুষকে তুলে নেওয়া হতো, এরপর মিলত না কোনো খোঁজ। গণঅভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতন হয়েছে। মানুষের আশা ছিল, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে গুমের এই ভয়ংকর সংস্কৃতিরও অবসান হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ও আইন নিয়ে আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে—গুমের ক্ষত শুকানোর আগেই কি পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসছে?