জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে দেশ আবারও কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফিরে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারকে ভেতর-বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলো পুনর্বহাল করা হয়। এসব সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে দেশ আবারও আগের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথে ফিরে যেতে পারে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার ঝুঁকি তৈরি হবে।
রোববার (৩ মে) সকালে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজিত জ্বালানি, অর্থনীতি সংস্কার ও গণভোট বিষয়ে জাতীয় কনভেনশনে তিনি এসব বলেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব ও পলিটিসাইজেশনের ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের সেবা দেওয়ার মৌলিক দায়িত্ব থেকে সরে গিয়েছিল।
দিলারা চৌধুরী বলেন, নির্বাচন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে। এর ফলে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জনগণের আস্থা কমে যায়। ২০২৪-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নানা সংস্কারের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে ফিরিয়ে আনার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে সেই প্রত্যাশা ভঙ্গ হচ্ছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের মাত্র দুই মাসের মাথায়ই জুলাই সনদ ও বিভিন্ন অধ্যাদেশে প্রস্তাবিত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো বাতিল বা উপেক্ষা করা হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার প্রস্তাব কার্যত বাতিলের পথে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরা হয় বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, বিচারকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া একটি স্বাধীন কমিটির মাধ্যমে করার প্রস্তাব থাকলেও সেটি প্রধানমন্ত্রীর হাতে রাখার চেষ্টা চলছে। এতে বিচার বিভাগ নির্বাহীর প্রভাবাধীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অতীতে যেমন বিচার বিভাগের মাধ্যমে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অভিযোগ উঠেছিল, তেমনি পরিস্থিতি পুনরায় তৈরি হতে পারে। জুডিশিয়ারি তখন আর স্বাধীন থাকে না, বরং নির্বাহীর ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়।
সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী একটি সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, রাষ্ট্রপতি ও জ্যেষ্ঠ বিচারপতিরা থাকবেন। এই কাউন্সিলের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ হলে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, শক্তিশালী সরকার প্রয়োজন হলেও সেই ক্ষমতার ওপর “চেক অ্যান্ড ব্যালান্স” না থাকলে তা কর্তৃত্ববাদে রূপ নিতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বক্তারা সতর্ক করেন, অতিরিক্ত নির্বাহী ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী প্রবণতা তৈরি করতে পারে। এছাড়া স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে, যা গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।
দিলারা চৌধুরী বলেন, এনসিপির মতো রাজনৈতিক উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে সরকারকে ভেতর-বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলো পুনর্বহাল করা হয়। এসব সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে দেশ আবারও আগের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথে ফিরে যেতে পারে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটা ফ্যাসিস্টদের একটা ক্লাব। এরা যখনই বিভিন্ন কায়দায় সন্ত্রাস করে ক্ষমতায় গিয়েছে, তখনই বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাস চালিয়ে নিজেদের গদি পাকাপোক্ত করতে চেয়েছে।’
‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের দেওয়া বক্তব্য সরাসরি নাকচ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সরকার কোনোভাবেই ক্রসফায়ার চায় না; বরং সরকার ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় স্বৈরাচারী কায়দায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, এ ধরনের গ্রেপ্তার মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিএনপির সমালোচনা করে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য এবং নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেছেন, দলের নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির জন্য রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুরগির দোকান, সবজির দোকান, চায়ের দোকান এমনকি মোড়ের রিকশাচালকদের কাছ থেকেও চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।