সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) একটি তালিকা প্রকাশ করে দাবি করা হচ্ছে, বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান মুক্তিযোদ্ধা নন, কারণ কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার ২০২১ সালে প্রকাশিত ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই’ তালিকায় ফজলুর রহমানের নাম নেই। বুধবার এনসিপি ডায়াসপোরা অ্যালায়েন্স এশিয়া নামের একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে “জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নেই বিএনপির ফজলুর রহমানের নাম” ক্যাপশনে পোস্ট করা হয়। Ismail Hossan Sumon নামে একজন ফজলুর রহমান মুক্তিযোদ্ধা নন দাবি করে লিখেন, “এভাবেই শত শত ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা এত দিন দেশে গলাবাজি করেছে। এসব ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ বাতিল করে সরকারি অর্থ লুটপাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা খুবই জরুরি।” দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, দাবিটি বিভ্রান্তিকর। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের নাম রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তালিকাই মূল তালিকা। জামুকার সুপারিশ ছাড়া যাঁদের নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বেসামরিক গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো তাদের নাম যাচাই বাছাই করার জন্য ২০২১ সালে যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে ফজলুর রহমানের নাম না থাকার সূত্র ধরে তার 'মুক্তিযোদ্ধা' পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন, যাচাই-বাছাই, গেজেট প্রকাশ এবং মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করতে কাজ করে। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে এটির কার্যক্রম সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ও মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীদের তালিকা প্রণয়ন ও গেজেট প্রকাশের জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ প্রদান; (গ) গেজেটভুক্ত কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী যথাক্রমে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী নন—মর্মে তদন্তে প্রমাণিত হলে তার গেজেট ও সনদ বাতিলের জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ প্রদান। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি জামুকার সুপারিশ ছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বেসামরিক গেজেটে অন্তর্ভুক্ত এমন ৩৮ হাজার ৩৮৬ জনের তালিকা যাচাই-বাছাই করা হয়। এর আগে যাদের তালিকা যাচাই-বাছাই করা হবে, তাদের নাম ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছিল। সে সময় প্রকাশিত তালিকা ঘিরে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছিল। জামুকা প্রথমে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ৩৯ হাজার ৯৬১ জনের তালিকা প্রকাশ করেছিল। তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় স্বীকৃত বিভিন্ন প্রমাণপত্রে নাম থাকার পরও অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম যাচাই-বাছাইয়ের তালিকায় রয়েছে। পরে এই তালিকা থেকে ১ হাজার ৫৯৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম বাদ দেওয়া হয়। এবং তালিকা যাচাইয়ের নির্ধারিত তারিখ ৯ জানুয়ারি স্থগিত করে ৩০ জানুয়ারি করা হয়। এরপরও কাটেনি বিভ্রান্তি। ২০২১ সালে নতুন করে প্রচারিত তালিকায় অনেক স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধার নামও দেখা যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, গণপরিষদের সদস্য, সংবিধানে স্বাক্ষরদাতা এবং লালমনিরহাট-কুড়িগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রয়াত এমপি আবুল হোসেনের নামও যাচাই-বাছাই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শুধু আবুল হোসেন নন, এ তালিকায় জেলার একমাত্র বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) আজিজুল হকের নামও আসে। যথাক্রমে তালিকার ১৪০ ও ১৭৬ নম্বরে ছিলেন তারা। স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নামও যাচাই-বাছাই তালিকায় আসায় সে সময় তাদের পরিবার ক্ষোভ প্রকাশ করে। অর্থাৎ, জামুকার প্রচারিত তালিকাটি মূলত ২০২১ সালে কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলায় যেসব মুক্তিযোদ্ধার নাম যাচাই-বাছাই করা হয়েছে, সেসব নামের তালিকা। সেই তালিকাকেই মুক্তিযোদ্ধাদের আসল তালিকা হিসেবে ধরে নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত হতে দ্য ডিসেন্ট জামুকার সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও কল্যাণ-২ শাখা এবং ঢাকা বিভাগের মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই ও জামুকার মামলা তদারকি ও মামলার ডাটাবেইস হালনাগাদ সংক্রান্ত কার্যক্রম) বীর আমির হামজার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের এমআইএসে থাকা তালিকাটিই প্রকৃত তালিকা। জামুকাতে আলাদা কোনো তালিকা থাকে না। মুক্তিযোদ্ধাদের যাবতীয় তথ্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেই থাকে। তিনি ফজলুর রহমানের নামে প্রচারিত তালিকাটি সম্পর্কে জানেন না বলে মন্তব্য করেন। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের তালিকায় রয়েছে ফজলুর রহমানের নাম যাচাইয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের জেলা ও উপজেলার নাম দিয়ে অনুসন্ধান করা হয়। এতে ফজলুর রহমান সম্পর্কে সচিত্র তথ্য পাওয়া যায়। এখানে ফজলুর রহমানের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ বা তথ্য হিসেবে তার লাল মুক্তিবার্তা ও বেসামরিক গেজেট নম্বর রয়েছে। নম্বরগুলো হলো, লাল মুক্তিবার্তা (১১৭০৬০১৩৪) ও বেসামরিক গেজেট (১৯৮৯)। এই দুটি নম্বর দিয়ে আলাদা আলাদা অনুসন্ধানেও বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়।