বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়নে এক ধরনের দ্বৈত চিত্র উঠে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নেতৃত্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন বলছে, নির্বাচনে কোনো ধরনের ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ তাদের চোখে পড়েনি। তবে একইসঙ্গে নির্বাচনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য করতে ১৯টি সুপারিশও দিয়েছে তারা। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত চূড়ান্ত সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড থেকে আসা পর্যবেক্ষকেরা অংশ নেন। সংবাদ সম্মেলনে মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস বলেন, “একটি বিশ্বাসযোগ্য এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনায় সম্পন্ন এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও আইনের শাসন পুনরুদ্ধারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এটি সকল অংশীজনের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি একটি অভিন্ন অঙ্গীকারের প্রতিফলন।” তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, ইতিবাচক মূল্যায়নের পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, “যদিও এই নির্বাচন জনমনে আস্থা বৃদ্ধি করেছে, তবুও কিছু আইনি ও পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। এসব বিষয় জুলাইয়ের ‘জাতীয় চার্টার’ এবং পরবর্তী সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে।” ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইভার্স ইজাবস বলেন, “নির্বাচনে কোনো ধরনের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং আমাদের চোখে পড়েনি। যদি কোনো রাজনৈতিক দলের এমন অভিযোগ থাকে, তাহলে তারা আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে পারে।” ইইউ মিশনের মতে, ২০০৮ সালের পর এ ধরনের একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। তারা বলছে, নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা সন্তোষজনক ছিল এবং ভোটগ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের কোনো অস্বচ্ছতা পরিলক্ষিত হয়নি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছভাবে প্রচারণা চালাতে পেরেছেন এবং নির্বাচনকালীন সময়ে উদ্ভূত অভিযোগ বা সংকট দ্রুত ও কার্যকরভাবে সমাধান করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের সুযোগও পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। তবে এই ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি নির্বাচনব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেছে মিশনটি। বিশেষ করে নির্বাচনী অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আইনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিবেচনায় মোট ১৯টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ছয়টিকে অগ্রাধিকারযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইভার্স ইজাবস বলেন, “নির্বাচন একটি চলমান প্রক্রিয়া। উন্নতির সব সময়ই সুযোগ থাকে। আমরা আশা করি, আমাদের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতের নির্বাচন আরও শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।” জানা যায়, গত বছরের শেষ দিক থেকে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন বাংলাদেশে কাজ শুরু করে। নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড থেকে আসা মোট ২২৩ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দেশের ৬৪টি জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর এবার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নির্বাচন প্রক্রিয়ার শক্তি, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ইইউর এই মূল্যায়নে একদিকে যেমন নির্বাচনের ওপর আস্থার বার্তা এসেছে, অন্যদিকে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে ‘ইঞ্জিনিয়ারিংমুক্ত’ নির্বাচন বললেও, সামনে থাকা ১৯টি সুপারিশই এখন ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।