> জামায়াতকে “রাজনৈতিকভাবে নির্মূল” করার আহ্বান বিএনপি মহাসচিবের
> আওয়ামী লীগের পুরনো রাজনৈতিক ভাষার প্রতিধ্বনি —দাবি বিশ্লেষকদের
> জিয়াউর রহমানের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির স্পষ্ট বৈপরীত্য
> খালেদা জিয়ার সময়ে জামায়াত ছিল সরকার পরিচালনার অংশীদার
> “ছদ্মবেশী বাম প্রভাব” নিয়ে দলের ভেতরে সন্দেহ ও আলোচনা
> বিশ্লেষকদের আশঙ্কা: মিত্রকে দূরে ঠেলে বিএনপি নিজেই শক্তি হারাতে পারে
> বিরোধী শিবিরে বিভাজন তৈরি হলে রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে প্রতিপক্ষ
উত্তরের হাওয়ায় এখন বিচিত্র সব গন্ধ। রাজনীতির ময়দানে যারা দীর্ঘকাল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পথ চলেছে, তাদের ভেতরে কি তবে ফাটল ধরল? নাকি এই ফাটল স্রেফ কথার কথা? বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি জামায়াতকে নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা নিয়ে এখন সরগরম চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অন্দরমহল। তিনি বলেছেন, জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের চেষ্টা করা উচিত। এই একটি বাক্যই যেন অনেক হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, এই কথার মাধ্যমে ফখরুল সাহেব কার্যত আওয়ামী লীগের সুরেই কথা বলছেন। যে আওয়ামী লীগ এখন পলাতক, যে আওয়ামী লীগ দশকের পর দশক ধরে জামায়াতকে নির্মূল করার ডাক দিয়ে এসেছে, মির্জা ফখরুলের কণ্ঠে সেই একই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি বিএনপির ভেতরেই ছদ্মবেশী বাম রাজনীতিকরা ডালপালা মেলছেন? তারা কি সুকৌশলে বিএনপিকে সেই গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, যেখানে আজ আওয়ামী লীগ গিয়ে ঠেকেছে? ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বিএনপির ভিত্তি এবং অগ্রযাত্রার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক ছিল গভীর এবং কৌশলগত। অথচ আজকের পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায় এক ভিন্ন বাস্তবতা। সত্তরের দশকের শেষের দিকে তিনি যখন বহুদলীয় গণতন্ত্রের দুয়ার খুলে দিলেন, তখন তিনি জামায়াতকে রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এটি কেবল কোনো আইনি সুযোগ ছিল না, বরং ছিল একটি রাজনৈতিক দর্শন। জিয়াউর রহমান বুঝেছিলেন, এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের একটি বড় অংশকে মূল ধারার রাজনীতিতে যুক্ত না করলে জাতীয় ঐক্য সম্ভব নয়। তিনি জামায়াতকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছিলেন এবং তাদের সঙ্গে একটি সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখেও সদ্ভাব রাখতেন। সে সময় বাম দলগুলোর প্রচণ্ড বিরোধিতা সত্ত্বেও জিয়া তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তার সেই দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই বাংলাদেশে এক বিশাল ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছিল।
জামায়াতের প্রতি জিয়ার এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কেবল রাজনৈতিক কৌশলের অংশ ছিল না, বরং এটি ছিল তার অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। তিনি জানতেন, এ দেশের মাটিতে বামপন্থী বা অতি উদারপন্থী রাজনীতির চেয়ে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয় অনেক বেশি কার্যকর। কিন্তু আজকের বিএনপির মহাসচিব যখন সেই দলটিকে নির্মূলের কথা বলেন, তখন তা জিয়ার আদর্শের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।
জিয়াউর রহমানের পর বেগম খালেদা জিয়া যখন বিএনপির হাল ধরলেন, তিনি জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর থেকেই জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সখ্যতা বাড়তে থাকে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে সেই সখ্যতা চারদলীয় জোটে রূপ নেয়। বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতের ওপর কতটা গভীর আস্থা রাখতেন, তার প্রমাণ মেলে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের শাসনামলে। সে সময় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মন্ত্রিসভায় জায়গা দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, জামায়াত কেবল রাজপথের আন্দোলন নয়, সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিএনপির অপরিহার্য অংশীদার।
খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে রাজনীতি করেছেন। আন্দোলন হোক কিংবা নির্বাচন, জামায়াত ছিল বিএনপির সবচেয়ে বিশ্বস্ত শক্তি। এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের কঠিন সময়েও জামায়াত বিএনপির পাশ থেকে সরেনি। খালেদা জিয়া বারবার তার বক্তব্যে জামায়াতকে একটি সুশৃঙ্খল ও দেশপ্রেমিক শক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। অথচ আজ মির্জা ফখরুল ইসলামের কণ্ঠে যখন ভিন্ন সুর শোনা যায়, তখন তৃণমূলে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সাধারণ কর্মীরা প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন, তবে কি বিএনপি তার দীর্ঘদিনের মিত্রকে বিসর্জন দিয়ে বামপন্থীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে?
বিপরীত দিকে তাকালে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী বাম দলগুলোর প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্যই ছিল জামায়াতকে নির্মূল করা। গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছে। দলটিকে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য হেন কোনো কাজ নেই, যা তারা করেনি। তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বাম দলগুলো সবসময়ই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে এসেছে। আওয়ামী লীগের এই জামায়াতবিদ্বেষ মূলত তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি বড় হাতিয়ার ছিল। তারা সবসময়ই চেয়েছে দেশে একটি মেরুকরণ বজায় রাখতে, যেখানে একপাশে থাকবে তারা আর অন্যপাশে থাকবে তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’ শক্তি।
জামায়াতকে ঘায়েল করতে পারলে বিএনপির শক্তিতে টান পড়বে—এই অঙ্কটি আওয়ামী লীগ খুব ভালোভাবেই জানত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে এবং পলাতক, ঠিক সেই সময়ে বিএনপির মহাসচিবের কণ্ঠে আওয়ামী লীগের পুরোনো বুলি শোনা যাচ্ছে। এতে অনেকেই সন্দেহ করছেন যে, বিএনপির ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ছদ্মবেশী বামরাই কি তবে এই ধরনের নীতি নির্ধারণ করছেন?
রাজনীতিতে আদর্শের লড়াই বড় কঠিন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজে ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার এই রাজনৈতিক পটভূমি এখন অনেকের কাছে সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা মনে করছেন, ফখরুল সাহেব হয়তো বিএনপির সাইনবোর্ড ব্যবহার করছেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে লালন করছেন সেই পুরোনো বামপন্থী মানসিকতা। যে বামপন্থীরা এ দেশে কখনোই জনগণের বিশাল সমর্থন পায়নি, তারা সবসময়ই বড় দলগুলোর ওপর ভর করে নিজেদের টিকে থাকতে চেয়েছে। বিএনপির মতো একটি বিশাল জাতীয়তাবাদী দলে এই বামপন্থী অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে দলকে তার মূল শেকড় থেকে বিচ্যুত করার একটি নীলনকশা কাজ করছে কি না, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
আওয়ামী লীগের পরিণতি আজ সবার জানা। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে তারা আজ পালিয়ে বেড়াচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বিএনপিও যদি আওয়ামী লীগের মতো একই পথে হাঁটে এবং নিজেদের মিত্রদের শত্রু বানিয়ে ফেলে, তবে তাদের পরিণতিও ভয়াবহ হতে পারে। জামায়াতকে নির্মূলের কথা বলা মানে আসলে এ দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রতিপক্ষ বানানো, যা কোনোভাবেই বিএনপির জন্য কল্যাণকর হতে পারে না।
গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপি মানেই ছিল এক ধরনের জাতীয়তাবাদী ভরসা। সেখানে জামায়াতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল অনেকটা পরিপূরক। রাজপথের লড়াইয়ে জামায়াতের কর্মীরা যে কঠোর পরিশ্রম করে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন যদি কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তাদের নির্মূলের ডাক দেওয়া হয়, তবে দেশ পরিচালনায় বিএনপির একলা চলার ক্ষমতা কতটুকু, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। মির্জা ফখরুল হয়তো আধুনিক ও প্রগতিশীল সাজার চেষ্টা করছেন, কিন্তু রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে।
আওয়ামী লীগ যখন জামায়াতকে নির্মূল করতে চেয়েছিল, তখন তাদের হাতে ছিল রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা। কিন্তু আজ বিএনপি যখন বহু বছর পর ক্ষমতায় গেছে, তখন নিজেদের রাজনীতি সুসংগঠিত করার বদলে দীর্ঘদিনের মিত্রদের ওপর আঘাত করা কতটুকু যৌক্তিক? এতে কেবল আওয়ামী লীগের ফেলে আসা এজেন্ডাই বাস্তবায়িত হচ্ছে। পলাতক আওয়ামী লীগ হয়তো মনে মনে হাসছে এই ভেবে যে, তারা যা সরাসরি করতে পারেনি, তা আজ বিএনপির মহাসচিবের মুখ দিয়ে বলানো হচ্ছে।
বাম দলগুলো সবসময়ই সুবিধাবাদী অবস্থান নেয়। তারা এক সময় আওয়ামী লীগের নৌকায় চড়ে বৈতরণী পার হতে চেয়েছিল। এখন আবার তারা বিএনপির কাঁধে সওয়ার হওয়ার চেষ্টা করছে। এই বাম রাজনীতিকদের মূল লক্ষ্যই হলো বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া। মির্জা ফখরুল ইসলাম যদি তাদের এই ফাঁদে পা দেন, তবে বিএনপির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যারা নিজেদের শেকড় এবং মিত্রদের অবজ্ঞা করে, তারা রাজনীতির ময়দান থেকে হারিয়ে যায়।
জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়া যে রাজনৈতিক ধারা তৈরি করেছিলেন, সেখানে জামায়াত ছিল একটি বাস্তবতা। সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে স্রেফ কথার ফুলঝুরি ছুটিয়ে ফখরুল সাহেব হয়তো সাময়িক বাহবা পাচ্ছেন কোনো কোনো মহলে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি বিএনপির জন্য বড় বিপদ ডেকে আনবে। সাধারণ কর্মীরা আজ স্তম্ভিত। তারা দেখছে, যে দলের বিরুদ্ধে তারা এতদিন লড়াই করেছে, সেই দলের নেতারাই এখন তাদের নেতাদের মুখ দিয়ে কথা বলছে। এটি কেবল বিভ্রান্তি নয়, বরং রাজনীতির এক চরম পরিহাস।
শেষ পর্যন্ত রাজনীতির মাঠেই সব ফয়সালা হবে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই বক্তব্য কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো মন্তব্য, নাকি সুগভীর কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ—তা সময় বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, বিএনপির ভেতরে এখন আদর্শিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। একদিকে জিয়ার সত্যিকারের অনুসারী জাতীয়তাবাদী শক্তি, আর অন্যদিকে ছদ্মবেশী বাম ভাবধারা। এই লড়াইয়ে যদি বামপন্থীরা জিতে যায়, তবে বিএনপির কপালে আওয়ামী লীগের মতোই দুর্ভোগ জুটতে পারে। জামায়াতকে নির্মূল করার স্বপ্ন যারা দেখছেন, তারা আসলে আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
এ দেশের মাটি আর মানুষের রাজনীতি বুঝতে হলে শেকড়ের দিকে তাকাতে হবে। স্রেফ চটকদার কথা বলে বা বামপন্থীদের সন্তুষ্ট করে ক্ষমতায় যাওয়া হয়তো সম্ভব, কিন্তু টিকে থাকা সম্ভব নয়। মির্জা ফখরুল কি সত্যিই বিএনপিকে আওয়ামী লীগের পথে নিয়ে যাচ্ছেন? নাকি এটি স্রেফ তার ব্যক্তিগত মত? এই প্রশ্নের উত্তর এখন বিএনপির কোটি কোটি সমর্থক খুঁজছে। রাজনীতির এই জটিল খেলায় শেষ চালটি কে দেয়, তা দেখতে আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে মেঘের আড়ালে যে সূর্য হাসছে না, বরং আরও ঘন কালো মেঘ জমছে, তা বোঝা খুব একটা কঠিন নয়।
বরিশাল বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ফলাফল দলটির জন্য বড় ধাক্কা। ২১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে জয় এসেছে মাত্র দুটিতে, পরাজয় ১৯টিতে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জামায়াতের জাতীয় পর্যায়ে যে অবস্থান তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বরিশালের এই ফলাফল বেশ বেমানান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে -বরিশালে সমস্যাটা আসলে কোথায়?
রাজনীতিতে পতনেরও একটি ভাষা আছে। কেউ ক্ষমতা হারান, কেউ দল হারান, কেউ জনসমর্থন হারান। আবার কেউ কেউ এতটাই সবকিছু হারান যে শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলতে হয় তৃতীয় কোনো দেশের মাটি থেকে। শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান অনেকটা তেমনই। একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে যার বিকল্প কল্পনা করাটাই ছিল প্রায় অপরাধের শামিল, আজ সেই শেখ হাসিনাকেই নিজের অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন, সে প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। একসময় যিনি বলতেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো সহজ নয়, আজ তার নিজের দেশে ফেরাই অনিশ্চিত। একসময় যিনি বিরোধীদের রাজনীতি করার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলতেন, আজ তিনি নিজেই অন্য একটি দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার নিজের পিঠ চাপড়াতে পারে। তবে এই আনন্দের অন্তরালে জমা হচ্ছে একটা গোটা দেশের হাহাকার। দীর্ঘ ১১ বছর পর এই বেতন কাঠামো এলো। ২০টি গ্রেডে থাকা প্রায় ২৪ লাখ সরকারি ও সামরিক কর্মী এবং সাড়ে ৯ লাখ পেনশনভোগী এর সুফল পাবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের বাকি সাড়ে ষোলো কোটি মানুষের কী হবে?
বছর ঘুরে আবার এসেছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি ফিরে এসেছে, কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয়নি। আড়াই শতাধিক পরিবার এখনো জানে না, তাদের স্বজন কোথায়। কেউ বছরের পর বছর ধরে ফিরে আসার অপেক্ষায়, কেউ আবার জানেনই না প্রিয় মানুষটির কী হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে গুম ছিল বিরোধী মত দমনের অন্যতম ভয়ংকর হাতিয়ার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বা সাদা পোশাকে মানুষকে তুলে নেওয়া হতো, এরপর মিলত না কোনো খোঁজ। গণঅভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতন হয়েছে। মানুষের আশা ছিল, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে গুমের এই ভয়ংকর সংস্কৃতিরও অবসান হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ও আইন নিয়ে আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে—গুমের ক্ষত শুকানোর আগেই কি পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসছে?