বাংলাদেশের ইতিহাসে মাত্র দুই মাসের মধ্যে কোনো সরকার এতটা অজনপ্রিয় হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, 'এই সরকার দুই মাসে যতটা অজনপ্রিয় হয়েছে, আমরা জানি না আগামী ছয় মাসে তার পরিণতি কী হবে, তার অবস্থান কী হবে।’
আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক সমাবেশে নাহিদ ইসলাম এ কথাগুলো বলেন। জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে এ সমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা দেশে কোনো অস্থিতিশীলতা চাই না। আমাদের দাবি, একটাই—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে প্রকৃত সম্মান দেওয়া, জুলাই শহীদ পরিবারকে প্রকৃত সম্মান দেওয়া, আহত যোদ্ধাদের প্রকৃত সম্মান দেওয়া, আমরা সেটির জন্য রাজপথে আছি, সংসদে আছি। ইনশা আল্লাহ আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের সে দাবি আদায় করে ছাড়ব।’
৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর সংস্কারের প্রতিটি পদে বিএনপি বাধা দিয়েছিল উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণের চাপে গণভোটে রাজি হলেও নির্বাচনের পরে বিএনপি গণভোটকে অস্বীকার করা শুরু করেছে; কিন্তু তাদের জন্মই হয়েছিল গণভোটের মাধ্যমে। পারতপক্ষে বিএনপি এখন তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে শুরু করেছে। তারা প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পথে হাঁটছে। পুরোনো স্বৈরাচারের পথে তারা দেশকে এগিয়ে নিতে চাইলে জনগণ রুখে দাঁড়াবে, তরুণেরা আবার রাস্তায় দাঁড়াতে বাধ্য হবে।
বিএনপি কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে জনগণের মন ভোলানোর চেষ্টা করছে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, এসব কার্ড দিতে দিতেই তাদের তেল ফুরিয়ে গেছে, জ্বালানি ফুরিয়ে গেছে; কিন্তু বিএনপির মন্ত্রীরা সংসদে বলছেন, দেশে জ্বালানিসংকট নেই। তারা বাস্তব সমস্যাকে অস্বীকার করছে। অর্থনৈতিক সংকট ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিকে অস্বীকার করছে। বিরোধী দল সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে চাইলেও সরকার সেই দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে।
সমাবেশে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, সরকার সুশাসন নিশ্চিত করতে পারছে না। সরকার সামনে অনেক সমস্যায় পড়তে পারে। পেট্রল-ডিজেলের কারণে দেশে দুর্ভিক্ষও হতে পারে। অর্থনীতি সামাল দেওয়া যাবে না। জনগণের ওপর ট্যাক্স তিন-চার গুণ বৃদ্ধি পাবে। ইতিমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। এর প্রতিফলনও প্রত্যেকের জীবনে ঘটবে।
সরকারকে দেশের শান্তি কীভাবে আসবে সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে বলেন অলি আহমদ। তিনি বলেন, জাতীয় সমস্যার সমাধান করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কীভাবে করা যায়, সেই চিন্তা করতে হবে। তা না হলে ৬৪ জেলায় মিছিল হবে, সেটি সামাল দেওয়ার ক্ষমতা সরকারের নেই।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বিএনপি জুলাই শহীদদের কৃতিত্বকে খাটো করে দেখার চেষ্টা করছে। তারা এখন গণভোটের রায় নিয়ে টালবাহানা করছে। বিএনপির রাজনীতি এখন সুবিধাবাদী ও দ্বিচারিতার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। দ্বিচারিতা করে তারা একবার গাঙ পার হতে পেরেছে, ভবিষ্যতে তারা জাতির কাঠগড়ায় আসামি হিসেবে চিহ্নিত হবে।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান ও হামিদুর রহমান আযাদ, খেলাফত মজলিসের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সাখাওয়াত হোসেন, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির মুখলেসুর রহমান কাসেমী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) চেয়ারম্যান তাসমিয়া প্রধান, জামায়াতের ঢাকা দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জসীম উদ্দিন সরকার, শ্রমিককল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আতিকুর রহমান, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম ও জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম।
জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষে বক্তব্য দেন শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা ও জামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী রোকেয়া বেগম, শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম, মিকদাদ হোসেন খান আকিবের বাবা দেলোয়ার হোসেন, শহীদ সৈয়দ মুনতাসীর রহমান আলিফের বাবা গাজিউর রহমান, শহীদ শেখ মেহেদী হাসান জুনায়েদের বাবা শেখ জামাল হাসান, শহীদ ফয়সাল আহমদের বাবা জাকির হোসেন, শহীদ মেহেরুন্নেসার বাবা মোশাররফ হোসেন, শহীদ জোবায়ের ওমর খানের বাবা জাহাঙ্গীর আহমেদ খান, গণ-অভ্যুত্থানে হাত হারানো জুলাই যোদ্ধা আতিকুল ইসলাম, আহত জুলাই যোদ্ধা রেসালাত বিন নাঈম ও কামরুল হাসান।
সমাবেশের সঞ্চালক ছিলেন জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটা ফ্যাসিস্টদের একটা ক্লাব। এরা যখনই বিভিন্ন কায়দায় সন্ত্রাস করে ক্ষমতায় গিয়েছে, তখনই বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাস চালিয়ে নিজেদের গদি পাকাপোক্ত করতে চেয়েছে।’
‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের দেওয়া বক্তব্য সরাসরি নাকচ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সরকার কোনোভাবেই ক্রসফায়ার চায় না; বরং সরকার ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় স্বৈরাচারী কায়দায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, এ ধরনের গ্রেপ্তার মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিএনপির সমালোচনা করে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য এবং নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেছেন, দলের নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির জন্য রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুরগির দোকান, সবজির দোকান, চায়ের দোকান এমনকি মোড়ের রিকশাচালকদের কাছ থেকেও চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।