তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপের আভাস মিলছে। জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ধারাবাহিক কর্মসূচি, লংমার্চের ঘোষণা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা ঘিরে রাজনীতির মাঠ আবারও সরব হয়ে উঠছে কি না, এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন দাবিতে সংসদের ভেতরে-বাইরে সক্রিয় রয়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনসহ বিভিন্ন দাবিতে ঢাকা থেকে পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় শহর অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জোটটি।
ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে প্রথম লংমার্চ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা করে কর্মসূচিটি চট্টগ্রামের লালদিঘি মাঠে গিয়ে শেষ হবে। এ কর্মসূচি ঘিরে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে জোটভুক্ত দলগুলো। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য বিভাগেও একই ধরনের কর্মসূচি পালনের পর আগামী ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। পাশাপাশি বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদের ভেতরেও সরব রয়েছে বিরোধী দল।
অন্যদিকে নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে মাঝেমধ্যে সড়কে ঝটিকা মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে গত ৫ আগস্ট ভার্চুয়াল বক্তব্যে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে যেকোনো মূল্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফেরার ক্ষেত্রে কোনো বাধা তিনি মানবেন না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সরকারের দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের এমন তৎপরতায় আগামী দিনে দেশের রাজনীতির গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। ছয় মাসের মাথায় বিরোধী দলের এই আন্দোলন সরকারকে কতটা চাপে ফেলতে পারবে, সরকারই বা কীভাবে তা মোকাবিলা করবে, এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে তার রাজনৈতিক ও আইনগত প্রভাব কী হবে, তা নিয়েও চলছে আলোচনা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ মনে করছেন, বিরোধী দলের বর্তমান কর্মসূচি মূলত রাজপথে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার কৌশল। এখনই সরকারকে বড় ধরনের চাপে ফেলার মতো কর্মসূচিতে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার বাস্তবতা নিয়েও এখনই নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করা কঠিন বলে মনে করছেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দল রাজপথে কর্মসূচি দেবে, এটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। তবে তারা এখনই মাঠ গরম করার মতো কোনো কর্মসূচি দেবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ এর ফলে সরকার বিপাকে পড়লে বিরোধী দলও এর রাজনৈতিক দায় ও প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
তিনি বলেন, “এখন তারা যা করছে, সেটি হচ্ছে বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান জানান দেওয়ার কৌশল। আর আওয়ামী লীগ ফিরবে কি না বা শেখ হাসিনা আসলেই দেশে ফিরবেন কি না, সেটিও এখনই সুনির্দিষ্ট করে বলার সময় আসেনি। বিষয়টি পর্যবেক্ষণের।”
১১ দলের আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা মিলবে?
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের লংমার্চ কর্মসূচি সফল করতে জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে একাধিক দফা বৈঠক হয়েছে। কর্মসূচিকে ব্যাপকভাবে প্রচারের লক্ষ্যে গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে পোস্টার ও লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রচারণা।
তবে এত প্রস্তুতির পরও প্রশ্ন উঠেছে, সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় বিরোধী দলের এমন কর্মসূচিতে নিজেদের নেতাকর্মীদের বাইরে সাধারণ মানুষের কতটা অংশগ্রহণ থাকবে? জনসম্পৃক্ততা কম হলে আন্দোলনের রাজনৈতিক সাফল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
অবশ্য বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ মনে করেন, কোনো আন্দোলন যদি সরাসরি জনস্বার্থ ও জনদাবির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ তাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে পারে। সেক্ষেত্রে ১১ দলের দাবিগুলো কতটা গণমুখী এবং মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই নির্ধারণ করবে রাজপথে কর্মসূচিটির গ্রহণযোগ্যতা।
অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের নেতারা মনে করছেন, তাদের প্রতিটি দাবিই জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। ফলে কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকবে বলে তারা আশাবাদী।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সারোয়ার তুষার বলেন, কর্মসূচি সফল করতে মিত্রদলগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও সাড়া দেখা যাচ্ছে। তাদের দাবিগুলো জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হওয়ায় মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মক্কা চুক্তি, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি কিংবা মার্কিন বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে বিরোধিতা না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে তারা ইতোমধ্যে কিছু কথা বলেছেন। মক্কা চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা তার জানা নেই। তবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত হলে বিরোধী দলের অবস্থান তুলে ধরা হবে।
আওয়ামী লীগ ফিরতে চাইলে পরিস্থিতি কি ভিন্ন হবে?
জামায়াতসহ ১১ দলের আন্দোলনের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা। গত ৫ আগস্ট ভার্চুয়াল বক্তব্যে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা। তিনি যেকোনো মূল্যে দেশে ফিরবেন এবং আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন বলেও জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ হবে, তেমনি জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়াও পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। তারা যদি শেখ হাসিনার ফেরার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরির উদ্যোগ নেয়, তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, শেখ হাসিনা তার ঘোষণা অনুযায়ী দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করতে পারলে আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের একটি ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। এতে দলটির নেতাকর্মীরাও উজ্জীবিত হতে পারেন। তবে তিনি আদৌ দেশে ফিরবেন কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
তার মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির সম্ভাব্য কোনো সমঝোতার ওপরও নির্ভর করতে পারে। একই সঙ্গে জুলাইয়ের ঘটনাবলি নিয়ে শেখ হাসিনার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তার বক্তব্যে জুলাইয়ের ঘটনাকে ঘিরে অনুশোচনার কোনো স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হবে কি না, তা অনেকাংশে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে বলে মনে করেন সাইফুল হক।
পরিস্থিতি কি ঘোলাটে হতে পারে?
সরকারের দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পৃথক তৎপরতায় আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। বিরোধী দল বলছে, তাদের কর্মসূচির উদ্দেশ্য রাজপথ উত্তপ্ত করা নয়; বরং জনগণের অধিকার আদায়ে শান্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক আন্দোলন গড়ে তোলা।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, গত ছয় মাসে বিরোধী দল সরকারের বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটেরও কার্যকর সমাধান করতে পারছে না। এ কারণেই জনগণের অধিকার আদায়ে তারা কর্মসূচি পালন করছেন।
তিনি বলেন, “আমরা কোনো জ্বালাও-পোড়াও করছি না। সেহেতু রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার কারণ দেখছি না।”
অন্যদিকে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিরোধী দল আন্দোলন করবে, এটি তাদের রাজনৈতিক অধিকার। তবে তাদেরও জনগণের কাছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রকৃত কারণ তুলে ধরা উচিত। বিরোধী দল হঠকারী কোনো কর্মসূচি নেবে না বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, সরকার তার সক্ষমতা অনুযায়ী দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এই সময়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি আশা করেন, বিরোধী দল এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করবে।
তিনি আরও বলেন, “ফ্যাসিবাদ প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”
সব মিলিয়ে ১১ দলীয় জোটের ধারাবাহিক কর্মসূচি, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা এবং সরকারের অবস্থান, এই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে রাজপথের কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ তৎপরতাই নির্ধারণ করবে দেশের রাজনীতি সত্যিই আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে কি না।