সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে সরকারকে জমিয়তের কঠোর বার্তা
শরিয়াহ বোর্ডে যাচাইয়ের দাবি

জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ চূড়ান্ত করার আগে এর প্রতিটি ধারা বিশেষজ্ঞ শরিয়াহ বোর্ডের মাধ্যমে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। দলটির নেতারা বলেছেন, মুসলমানদের সম্পত্তি বণ্টন, উত্তরাধিকার, হেবা ও মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়গুলো পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বিধানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই নতুন কোনো আইন বা আইনের কোনো ধারা যেন শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সোমবার জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের খাস কমিটির বৈঠকে এ দাবি জানানো হয়। দলের সভাপতি শাইখুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের সভাপতিত্বে এবং মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীর পরিচালনায় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে দলের সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী, সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, মাওলানা শেখ মুজিবুর রহমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা বাহাউদদীন যাকারিয়া ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা লোকমান মাযহারীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে জমিয়ত নেতারা বলেন, বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতার নিরাপত্তা, চিকিৎসা, ভরণ-পোষণ ও সম্মানজনক জীবনযাপন নিশ্চিত করা সন্তানের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। ইসলাম পিতা-মাতার অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে প্রবীণ পিতা-মাতার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের যেকোনো ইতিবাচক উদ্যোগ প্রশংসনীয়।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মুসলমানদের শরিয়াহসম্মত উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির মালিকানা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা তৈরি করা যাবে না বলে সতর্ক করেছেন দলটির নেতারা।
তারা বলেন, মুসলমানদের সম্পত্তি বণ্টন, উত্তরাধিকার, হেবা ও মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়গুলো ইসলামী শরিয়াহর সুস্পষ্ট বিধানের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই নতুন কোনো আইন প্রণয়ন বা বিদ্যমান আইনে সংশোধনের ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআন-সুন্নাহ নির্ধারিত মিরাস ও হেবার বিধান অক্ষুণ্ন রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
জমিয়ত নেতারা বলেন, পিতা-মাতার জীবনকালীন অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হলে সেটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু এর প্রয়োগের ফলে মুসলমানদের শরিয়াহসম্মত উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির মালিকানা ব্যবস্থায় কোনো বিরূপ প্রভাব পড়া উচিত নয়।
বিশেষ করে হেবা ও মিরাসের বিধানকে পাশ কাটিয়ে এমন কোনো আইনি কাঠামো তৈরি করা উচিত নয়, যা ভবিষ্যতে পারিবারিক বিরোধ কিংবা শরিয়াহবিরোধী সম্পত্তি বণ্টনের পথ তৈরি করতে পারে বলে মনে করে দলটি।
বৈঠকে নেতারা আরও বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তরের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আইন প্রণয়নের আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতি, ফকিহ, আলেম ও ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে একটি বিশেষজ্ঞ শরিয়াহ বোর্ড গঠন করে বিলটির প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করতে হবে।
তাদের দাবি, শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে আইনটি চূড়ান্ত করতে হবে। এতে একদিকে পিতা-মাতার জীবনকালীন অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে মুসলমানদের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী উত্তরাধিকার, হেবা ও সম্পত্তি হস্তান্তরের অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে।
জমিয়ত নেতারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, পিতা-মাতার অধিকার ও প্রবীণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য শরিয়াহর মিরাস, হেবা ও সম্পত্তি হস্তান্তরের বিধান অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
তারা বলেন, দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিও রাষ্ট্রকে সম্মান দেখাতে হবে। মানবিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনটি এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনার সঙ্গে কোনো ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
উল্লেখ্য, গত রোববার জাতীয় সংসদে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ পাস হয়। বিলে পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহ সন্তান বা নাতি-নাতনিকে অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে আইন অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে স্থানান্তরের বিধানও রাখা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বিলটি উত্থাপন করে বলেন, বিদ্যমান আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতি সম্পর্কে বিধান থাকলেও দাতার জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দান করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। প্রস্তাবিত বিধানটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে কার্যকর হবে এবং সব ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে।
আইনমন্ত্রীর দাবি, নতুন এই বিধান প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীন হেবা বা আইন দ্বারা স্বীকৃত অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতির ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।
তবে বিলটি নিয়ে সংসদেই বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিলটির ভোটেও অংশ নেয়নি বিরোধী দল। এরই মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকে বিলটির প্রতিটি ধারা শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানানো হলো।
ফলে পিতা-মাতার জীবনকালীন সম্পত্তির ভোগাধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আনা আইনটি একদিকে সামাজিক ও মানবিক সুরক্ষার প্রশ্নে আলোচনায় থাকলেও মুসলমানদের হেবা, মিরাস ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে ধর্মীয় মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।









