ব্যানার হাতে ২০-২৫ জন, ঘণ্টাব্যাপী বন্ধ সংসদ ভবন সড়ক
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে জনভোগান্তি

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে ঘিরে রাজধানীর সংসদ ভবন সড়ক এলাকাজুড়ে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, সংসদ ভবনের সামনের সড়কে ব্যানার হাতে ২০ থেকে ২৫ জন নেতাকর্মী অবস্থান নেওয়ায় একপাশের পুরো রাস্তাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে ব্যস্ত সময়ে সড়কে আটকে পড়েন অফিসগামীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ। ভোগান্তির পাশাপাশি নষ্ট হয় সাধারণ মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা।
সকালবেলার ব্যস্ত সময়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ে আশপাশের সড়কগুলোতেও। দীর্ঘ সময় যানবাহনে বসে থাকতে দেখা যায় যাত্রীদের। অনেকে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের দিকে রওনা হন। বিশেষ করে অফিসগামী মানুষদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ দেখা যায়।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর সংসদ ভবনের সামনে খেজুর বাগান ও খামারবাড়ি এলাকার সড়কে এমন চিত্র দেখা যায়।
সকাল থেকেই ওই সড়কে অফিসগামী মানুষের চাপ ছিল বেশি। একপর্যায়ে যানবাহন থেমে গেলে পেছনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। অনেকে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের দিকে রওনা দেন। কেউ কেউ বিকল্প পথ ব্যবহার করার চেষ্টা করলেও আশপাশের সড়কেও চাপ বেড়ে যায়।
‘২০-২৫ জনের জন্য এত মানুষের ভোগান্তি কেন?’
সড়কে আটকে থাকা মামুন মিয়া নামক এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী বলেন, ‘সকালে অফিসে যাওয়ার সময় এমনিতে রাস্তায় প্রচণ্ড চাপ থাকে। তার মধ্যে কয়েকজন মানুষ ব্যানার নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকায় পুরো রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের মতো হাজারো মানুষকে এর খেসারত দিতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক কর্মসূচি করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু সেই কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া কতটা যৌক্তিক? ২০-২৫ জন মানুষ রাস্তার পাশে বা নির্দিষ্ট জায়গায় কর্মসূচি করতে পারতেন। পুরো রাস্তা বন্ধ করার প্রয়োজন কী?’
আরিফুল ইসলাম নামক একজন মোটরসাইকেল আরোহী বলেন, ‘কোন রাস্তা কখন বন্ধ থাকবে, সেটা আগে জানানো হলে আমরা বিকল্প পথ নিতে পারতাম। কিন্তু কোনো পূর্বঘোষণা না থাকায় এসে দেখি রাস্তা বন্ধ। এখন ঘুরে যেতে হচ্ছে।’
‘আগে জানালে বিকল্প পথ নেওয়া যেত’
সড়কে আটকে থাকা আব্দুল কাইয়ুম নামক এক বাইকার বলেন, ‘সকালে বের হওয়ার আগে যদি জানা যেত যে এই সড়ক এক ঘণ্টা বন্ধ থাকবে, তাহলে অন্য রাস্তা দিয়ে যেতাম। কিন্তু কোনো তথ্য না থাকায় এসে এখানে আটকে থাকতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সকালে এই রাস্তায় অনেক যাত্রী থাকে। রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদেরও আয় কমে যায়। যাত্রীরা গন্তব্যে যেতে না পারলে আমরাও আটকে থাকি।’
কর্মসূচি রাজনৈতিক, ভোগান্তি নাগরিকের
রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন দল ও সংগঠনের কর্মসূচিতে প্রায়ই সড়কে অবস্থান, মিছিল কিংবা সমাবেশের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। এতে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মানুষের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন।
বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে সড়ক বন্ধ হলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের একাধিক সড়কে। একটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ হওয়ার পর সংযোগ সড়কগুলোতেও যানবাহনের চাপ বাড়ে। ফলে কয়েক মিনিটের কর্মসূচিও দীর্ঘ যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মসূচির জন্য বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে জনভোগান্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। কর্মসূচি আয়োজনের আগে সাধারণ মানুষের চলাচলের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে আগাম গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কোন সড়ক কখন বন্ধ থাকবে তা জানানো জরুরি।
‘সময়ও একটি সম্পদ’
সড়কে আটকে থাকা মানুষের ক্ষোভের বড় জায়গা ছিল সময়ের অপচয়। মেরাজ নামক এক গণমাধ্যমকর্মী বলেন, ‘সরকারি ব্যয় কমানোর কথা বলা হয়, অথচ মানুষের সময়ের যে অর্থনৈতিক মূল্য আছে, সেটার হিসাব কেউ করে না। এক ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা মানে শুধু বিরক্তি নয়, একজন মানুষের কর্মঘণ্টাও নষ্ট হওয়া।’
তার ভাষায়, ‘রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকবে, সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু নাগরিকের চলাচলের অধিকারও তো আছে। কর্মসূচি করার পাশাপাশি এমন ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে সাধারণ মানুষকে জিম্মি হতে না হয়।’
আগাম তথ্যের দাবি
নগরবাসীর দাবি, রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ রাখতে হলে অন্তত আগের দিন তা জানানো উচিত। এতে মানুষ বিকল্প রুট ব্যবহার করতে পারবেন এবং জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষও নিজেদের যাত্রা পরিকল্পনা করতে পারবেন।
রাজনৈতিক কর্মসূচি গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ হলেও সেই কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল ও কর্মঘণ্টা যেন অযথা নষ্ট না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নগর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের। রাজধানীর সড়কে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনায় নাগরিক ভোগান্তি কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা না হলে ‘এক যাবে, দুই আসবে’ ধরনের যানজট ও ভোগান্তির সংস্কৃতি থেকেই যাবে বলে মনে করছেন নগরবাসী।









