বাজেট নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থানে রাজনৈতিক দলগুলো

জাতীয় বাজেট উপস্থাপনকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে অর্থনীতি ও জনজীবন ঘিরে। সরকার দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাজেট ঘোষণা করে উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের বার্তা দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। জামায়াতে ইসলামী বাজেটকে জনবিরোধী ও লুটপাটের বাজেট আখ্যা দিয়ে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ করেছে এবং বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানানোর ঘোষণা দিয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বাজেটকে বাস্তবতাবিবর্জিত বলে সমালোচনা করেছে। একইসঙ্গে ইসলামী দল, বামপন্থী দল এবং ছাত্র সংগঠনগুলোও বাজেট, রাজনৈতিক সহিংসতা, পরিবেশ ও সাংগঠনিক কর্মসূচি ঘিরে সক্রিয় ছিল।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) মূলধারার গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলোর অফিসিয়াল সূত্র বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র দেখা গেছে।
বাজেট, সামাজিক সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে সরকার
দিনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উত্থাপন করেন, যা দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।
নতুন বাজেটে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ জন্য মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতার প্রস্তাব বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সরকার এটিকে গণঅভ্যুত্থানের অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
দিনটিতে ক্রীড়াক্ষেত্রেও সরকার সক্রিয় ছিল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া বিশ্বকাপ ফুটবল-২০২৬ উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট, স্যুভেনির শিট ও ডাটা কার্ড উন্মোচন করেন তিনি।
বাজেট সমর্থন, সাংগঠনিক কর্মসূচি ও বিতর্কে বিএনপি
ক্ষমতাসীন বিএনপি দিনজুড়ে বাজেটকে ঘিরে ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল রাজধানীতে আনন্দ মিছিল করে বাজেটকে স্বাগত জানায়। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রস্তাবিত বাজেটকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব একটি সৃজনশীল বাজেট হিসেবে অভিহিত করেন।
দলটির সহযোগী সংগঠন ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনও সক্রিয় ছিল। বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক চিকিৎসক লাঞ্ছনার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে বিভিন্ন স্থানে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অব্যাহত ছিল।
তবে দিনটিতে বিএনপিকে ঘিরে একাধিক বিতর্কিত ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। যশোরে যুবলীগ নেতাকে হত্যার ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। ভোলায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ, নওগাঁয় জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ, গাইবান্ধায় বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ এবং ট্রেনে ধূমপান নিয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়ার সঙ্গে রেলকর্মীর বাকবিতণ্ডার ঘটনা আলোচনায় আসে।
খাগড়াছড়িতে আওয়ামী লীগের হামলায় বিএনপির নেতাকর্মী আহত হওয়ার অভিযোগ এবং বরিশালে বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়েছে।
বাজেটবিরোধী অবস্থান, কূটনৈতিক যোগাযোগ ও জনইস্যুতে জামায়াত
জামায়াতে ইসলামী দিনটির কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ইস্যু—জাতীয় বাজেট—নিয়ে সবচেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দলটি প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘জনবিরোধী’ ও ‘লুটপাটের বাজেট’ আখ্যা দিয়ে সংসদে বাজেট উপস্থাপনের পরপরই রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে।
দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরদিন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাজেটের বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হবে।
জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, একটি দুঃখজনক ঘটনার পর তদন্ত ও সমাধানের পরিবর্তে লাইসেন্স বাতিল করা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।
কূটনৈতিক পর্যায়েও দলটি সক্রিয় ছিল। জাতীয় সংসদ ভবনে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার জামায়াত আমিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
অন্যদিকে নড়াইলে জামায়াতের এক নেতার ওপর হামলার ঘটনা এবং নীলফামারীতে দলীয় মতবিনিময় সভাও দিনটির আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল।
বাজেট সমালোচনা ও সাংগঠনিক সম্প্রসারণে এনসিপি
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বাজেট নিয়ে সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণ করেছে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বাজেটকে ‘চানাচুরের মতো’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি দেখতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তব উপকারিতা সীমিত।
দলটি আনুষ্ঠানিক বাজেট প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছে।
সাংগঠনিক দিক থেকে এনসিপি রাজনৈতিক পর্ষদে ছয় নতুন কেন্দ্রীয় নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা দলটির সম্প্রসারণ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রংপুরের গঙ্গাচড়ায় নতুন উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে মুন্সীগঞ্জে জেলা সার্চ কমিটির এক নেত্রীর পদত্যাগ এবং ফরিদপুরে উপজেলা আহ্বায়ককে ঘিরে শিক্ষার্থীদের অবরোধের ঘটনাও দলটির জন্য অস্বস্তিকর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাজেট নিয়ে ইসলামী দল ও বামপন্থী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া
বাজেটকে কেন্দ্র করে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বাজেটকে ‘আশাবাদে ভারাক্রান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন। দলটির বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে দায়িত্বশীল সম্মেলন এবং কর্মী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেছে দলটি।
খেলাফত মজলিস বাজেটকে ঋণনির্ভর, উচ্চাভিলাষী এবং অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক বলে মন্তব্য করেছে।
অন্যদিকে বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে সিপিবি বাজেটকে ‘বড় ফাঁপা বাজেট’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছে, এতে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো বা কর্মসংস্থান সৃষ্টির কার্যকর উদ্যোগ নেই। বাসদও অভিযোগ করেছে, সরকার এখনও ধনীদের ওপর প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর পরিবর্তে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের চাপ বজায় রাখছে।
ছাত্র রাজনীতিতে বাজেট, প্রতিবাদ ও পরিবেশ কর্মসূচি
ছাত্র সংগঠনগুলোও দিনভর সক্রিয় ছিল।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে সারাদেশে মিছিল করেছে। পাশাপাশি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা প্রদর্শনের উদ্যোগও নিয়েছে সংগঠনটি।
তবে হবিগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতার ওপর হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির মাদকবিরোধী অবস্থান, বৃক্ষরোপণ অভিযান, এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য দোয়া অনুষ্ঠান, মতবিনিময় সভা এবং সাংগঠনিক পুনর্মিলনী কর্মসূচি পালন করেছে। নোয়াখালীতে এক এসএসসি পরীক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় প্রতিবাদও জানিয়েছে সংগঠনটি।
রাজনৈতিক বার্তা কী?
দিনটির রাজনৈতিক চিত্রে জাতীয় বাজেটই ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। সরকার উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে উচ্চাভিলাষী বাজেট উপস্থাপন করেছে। বিএনপি সরকারের বাজেটকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন ও জনসমক্ষে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেছে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি বাজেটের বাস্তবতা ও জনকল্যাণমূলক দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ইসলামী ও বামপন্থী দলগুলোও সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা, স্থানীয় পর্যায়ের সংঘর্ষ এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দেখিয়েছে যে বাজেট বিতর্কের পাশাপাশি মাঠের রাজনীতিও সমানভাবে সক্রিয় রয়েছে।









