শনিবার (৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চ। রাজধানীর শাপলাচত্বর থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী ও মিরসরাই পার হয়ে চট্টগ্রামের লালদিঘিতে সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া কর্মসূচিটি দিনভর রাজনৈতিক আলোচনা ও প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বিভিন্ন পথসভা ও সমাবেশে উল্লেখযোগ্য জনসমাগমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ট্রেন্ডিং ছিল ছয় দফা দাবিতে বিরোধী জোটের এই লংমার্চ।
একই দিনে সরকারি দল বিএনপি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনায় বিরোধীদের সমালোচনার মাধ্যমে পাল্টা রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। এর বাইরে নাগরিক সমাজ ও ছাত্রসংগঠনগুলোর নানা তৎপরতাও রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব ফেলেছে।
১. সরকারি দল ও সরকারের কার্যক্রম
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত আলোচনা সভায় দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বর্তমান অস্থিতিশীলতার পেছনে স্বৈরাচারী শক্তির গোপন তৎপরতা রয়েছে কি না সে প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে দলের অন্যান্য নেতার বক্তব্যে বিরোধী দলের কর্মসূচি ও রাজনৈতিক ভাষার সমালোচনা উঠে আসে।
বিশেষ করে বিরোধীদের লংমার্চ-এর যৌক্তিকতা ও অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপটে লংমার্চ কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে দিনের সামগ্রিক রাজনৈতিক আলোচনায় সরকারের এই সমালোচনার তুলনায় লংমার্চের জনসমাগম ও বিরোধী নেতাদের বক্তব্য বেশি প্রাধান্য পায়।
এর বাইরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি একক প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। নাটোরে দলীয় নেতাদের বক্তব্যে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাই এবং মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের সাংগঠনিকভাবে মূল্যায়নের কথা বলা হয়।
তবে সরকারি দলের জন্য নেতিবাচক সংবাদও ছিল। পটুয়াখালীতে এক স্থানীয় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এবং ঝিনাইদহের শৈলকূপায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ দলীয় শৃঙ্খলা ও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন উঠেছে।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পররাষ্ট্রনীতি ও ধর্মীয় ব্যবস্থাপনার কিছু বিষয়ও আলোচনায় ছিল। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে অস্বাভাবিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যার মধ্যেও আলোচনার দরজা খোলা রাখার কথা বলেছেন তিনি। হজ নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সৌদি সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার কথাও জানিয়েছে সরকার।
২. বিরোধী দলের কার্যক্রম
দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চ। গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবিতে আয়োজিত এই কর্মসূচি রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রামের লালদিঘিতে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। পথে একাধিক স্থানে আয়োজিত সভা ও জনসমাগম কর্মসূচিটিকে জাতীয় পর্যায়ের একটি বড় রাজনৈতিক শোডাউনে পরিণত করে।
লংমার্চের রাজনৈতিক গুরুত্ব শুধু জনসমাগমে সীমিত ছিল না। বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা এ কর্মসূচিকে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে ছয় দফা দাবি মেনে নেওয়া, গণভোটের জনরায় বাস্তবায়ন এবং শাপলা চত্বর, পিলখানা ও জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে সরকারের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা এবং দাবি আদায়ে রাজনৈতিক আন্দোলন অব্যাহত রাখার বার্তা ছিল।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকও সরকারের উদ্দেশে কঠোর ভাষায় সতর্কতা উচ্চারণ করেন। ফলে লংমার্চটি কেবল একটি সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধির প্রচেষ্টা হিসেবেও প্রতীয়মান হয়েছে।
কর্মসূচির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বিরোধী জোটের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির দৃশ্যমান অংশগ্রহণ। জাতীয় নাগরিক পার্টির নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আখতার হোসেন, আসিফ মাহমুদ, সারজিস আলমসহ একাধিক নেতা কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন। তরুণ নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশেষ করে ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মসূচিটির প্রচার ও দৃশ্যমানতা বাড়িয়েছে।
জামায়াত একই দিনে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিও এগিয়ে নিয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে ড. নূরুল ইসলাম বাবুলকে প্রার্থী ঘোষণার মাধ্যমে দলটি রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনী রাজনীতিতেও সক্রিয় থাকার বার্তা দিয়েছে।
৩. অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রম
দিনের রাজনৈতিক আলোচনায় নাগরিক সমাজ ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। জাতীয় প্রেস ক্লাবে গণভোট বাস্তবায়ন নিয়ে আয়োজিত জাতীয় সংলাপে আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বর্তমান রাজনৈতিক ও বিচারিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন।
ছাত্ররাজনীতিতেও কিছুটা উত্তেজনার বিরাজ করেছে এ দিন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের এক নেতাকে ছাত্রদল কর্মীর চড় দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা, ভাঙচুর এবং পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ হয়। অন্যদিকে মিরসরাইয়ে লংমার্চ অতিক্রমের সময় জামায়াত আমিরকে এক যুবকের ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শনের ঘটনা আলোচনায় আসে; স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র ওই যুবককে ছাত্রদলের কর্মী বলে দাবি করেছে।
ছাত্রশিবিরের আলাদা কোনো বড় কর্মসূচির সংবাদ না থাকলেও সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা লংমার্চে সক্রিয় ছিলেন।