স্বাস্থ্য খাত জীবন-মরণের সাথে সম্পর্কিত, রাজনীতিকীকরণ করবেন না: জামায়াত
যোগ্য চিকিৎসকদের বঞ্চিত করে অযোগ্যদের পদায়নের অভিযোগ

দেশের স্বাস্থ্য খাতে যোগ্য ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের অবমূল্যায়ন করে অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতারা বলেছেন, স্বাস্থ্য খাত কোনো রাজনৈতিক পরীক্ষাগার নয়; এটি মানুষের জীবন-মরণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি মৌলিক সেবাখাত। তাই স্বাস্থ্য প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নেতৃত্বে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং অতীতের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানান জামায়াত নেতারা।
রোববার রাজধানীতে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দীন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ ডা. এস এম খালিদুজ্জামান। এছাড়া দলটির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন নেতা মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, “আপনার মূল দায়িত্ব বাদ দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে রাজনীতি করবেন, তা হতে দেওয়া যাবে না। স্বাস্থ্য খাত কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্র নয়। এটি মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন। একজন রোগী হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকলে তিনি কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে চিকিৎসা নেন না। তিনি একজন নাগরিক হিসেবে তার সাংবিধানিক অধিকার অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশা করেন। তাই স্বাস্থ্য খাতে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হয়।”
তিনি বলেন, “আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, যোগ্য ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মূল্যায়ন না করে অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসানো হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাত পরিচালনার ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তে অন্য বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। এটি শুধু অন্যায় নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ হুমকি।”
তিনি আরও বলেন, “এই নীতি স্পষ্টতই ফ্যাসিবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। যারা অতীতে স্বাস্থ্য খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে, জনগণের অর্থ লুটপাট করেছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে, তাদের পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ নতুন বাংলাদেশে থাকতে পারে না। শহীদদের রক্ত এবং ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চেতনা কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসন মেনে নেবে না।”
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “অতীতে যারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি করেছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার করেছে, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে। শুধু পদ পরিবর্তন বা বদলি নয়, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের সব দাবি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডা. এস এম খালিদুজ্জামান দেশের স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বলেন, “বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়। কারণ তারা জানে, সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। অথচ আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। জিডিপির তুলনায় এ খাতে ব্যয় ১ শতাংশেরও নিচে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক এবং উদ্বেগজনক।”
তিনি বলেন, “একটি জাতির উন্নয়ন শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে হয় না। মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। স্বাস্থ্য খাতকে অবহেলা করে কখনো টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব নয়।”
ডা. খালিদুজ্জামান আরও বলেন, “স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনার ঘাটতি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা বিদ্যমান। সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের অপ্রতুলতা, ওষুধের সংকট এবং সেবার মান নিয়ে জনগণের অসন্তোষ বাড়ছে। অথচ এসব মৌলিক সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অদক্ষতা ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সামনে আসছে।”
তিনি বলেন, “দেশে চলমান সামাজিক অস্থিরতা, হতাশা ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে উত্তরণের জন্যও একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ স্বাস্থ্য শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনমান, উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় অগ্রগতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।”
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অন্যান্য বক্তারা বলেন, বিগত সরকারের আমলে স্বাস্থ্য খাতে যে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয়করণের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে জনগণ এখনো কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তারা বলেন, চিকিৎসকদের এককভাবে দায়ী করে স্বাস্থ্য খাতের সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, নিয়োগ প্রক্রিয়া, বাজেট বণ্টন, ওষুধ সরবরাহ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিসহ পুরো ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে না পারলে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
বক্তারা আরও বলেন, জনগণের করের অর্থে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে দুর্নীতি ও বৈষম্যমুক্ত করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষ ও মেধাবী চিকিৎসকদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।
সবশেষে দেশের সার্বিক কল্যাণ, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, সুস্থতা এবং সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে মানববন্ধন কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।









