‘পলিটিক্যাল-ব্যুরোক্রেসি’ সমন্বয়ের বার্তা; মূল্যস্ফীতি-চাঁদাবাজি চাপে সরকার

ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দেশের অর্থনীতির মন্দাভাব ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা নিয়ে চাপে রয়েছে নতুন সরকার। একদিকে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, যা সরকারের জনপ্রিয়তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে দেশের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয়ের নতুন সমীকরণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে।
এ অবস্থায় বিএনপি সরকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তবে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের সম্পদের তথ্য এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনা সরকারের ‘সুশাসন’ ও ‘স্বচ্ছতা’র বার্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বিপরীতে প্রধান বিরোধীদল জামায়াত ধীরগতিতে সংসদ ও রাজপথ উভয় দিকেই সরকারকে চাপে রাখার কৌশলে এগুচ্ছে বলে জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে উঠে আসছে। অপর বিরোধীদল এনসিপি নিজেদের দলীয় অবস্থান সংহত করতে কাজ করে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবারের (৮ মে) আলোচিত ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার, প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজ ভিন্ন ভিন্ন ইস্যু নিয়ে সক্রিয় থাকলেও দিনশেষে প্রতিটি ঘটনা সরাসরি সুশাসন, অর্থনৈতিক মুক্তি ও রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসছে।
ডিসি সম্মেলন ও প্রশাসন: রাজনীতিকদের সঙ্গে সমন্বয়ের বার্তা
চার দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলন শেষে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য এক বিশেষ বার্তা নিয়ে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা। সম্মেলনে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার জন্য।
বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জেলা পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি বৈঠকে রাজনীতিকদের অন্তর্ভুক্ত করার যে তাগিদ দিয়েছেন, তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সমন্বয় প্রয়োজন হলেও তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাজনীতিকদের সংশ্লিষ্টতা নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ার অন্তরায় হতে পারে। এছাড়া বিগত সরকারের আমলের প্রায় ১০ হাজার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ডিসিদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
মূল্যস্ফীতিতে জনজীবনে নতুন উদ্বেগ
অর্থনৈতিক ফ্রন্টে সরকারের জন্য বড় দুঃসংবাদ হয়ে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন। এপ্রিলে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৯.০৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
ইরান যুদ্ধের প্রলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার দোহাই দিয়ে দেশে তেলের দাম ১৫-১৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। এর মধ্যে নতুন করে বিদ্যুতের দাম ১৭-২১ শতাংশ বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা। সুদের হার ও মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখা এখন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তবে রাজনৈতিক অগুরুত্বপূর্ণ নানা ইস্যুর চাপে দ্রব্যমূল ঊর্ধ্বগতির বিষয়টি অনেকটাই অবহেলিত। জাতীয় গণমাধ্যমেও তা উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পাচ্ছে না।
সংরক্ষিত নারী আসনে কোটিপতিদের আধিপত্য
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রত্যয় ছিল বৈষম্যমুক্ত একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। ১৪০০ শহীদের বিনিময়ে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলেও রাজনীতিতে পুজিপতিদের প্রাধান্য ও পরিবারতন্ত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত ৫০ জন সংসদ সদস্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘সুজন’ (সুশাসনের জন্য নাগরিক) এক চিত্র তুলে ধরেছে। হলফনামা অনুযায়ী, নির্বাচিত ৫০ জন এমপির মধ্যে ৩৭ জনই (৭৪ শতাংশ) কোটিপতি পরিবারের সদস্য।
শীর্ষ ধনী ১০ জন সংসদ সদস্যই বিএনপি থেকে নির্বাচিত। এছাড়া নির্বাচিতদের মধ্যে ৬ জন বর্তমানে মামলার আসামি। সুজন মনে করছে, সংরক্ষিত আসনগুলো মেধা বা যোগ্যতার চেয়ে দলীয় প্রধানের ‘অনুগ্রহ বিতরণের’ মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। সরাসরি ভোটের বিধান না থাকায় জনগণের কাছে এই এমপিদের দায়বদ্ধতা তৈরি হচ্ছে না, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চাঁদাবাজির হাতবদল ও বিএনপির দলীয় কোন্দল
নির্বাচনের আগে থেকেই বিএনপি ও তার অঙ্গ-সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল। ক্ষমতা গ্রহণের পর সে অভিযোগ আরও প্রবল হয়েছে। মিরপুরের পর এবার মহাখালী, পুরান ঢাকা ও বিমানবন্দরের চাঁদাবাজি নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ডিএমপির তালিকায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজির স্পট ও নিয়ন্ত্রকদের নাম উঠে এসেছে, যেখানে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট।
কড়াইল বস্তি থেকে শুরু করে কাপ্তান বাজার ও বিমানবন্দর এলাকার ফুটপাত; সবখানেই চাঁদার হাতবদল হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের চাঁদাবাজরা অপসারিত হলেও সেখানে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি থেমে নেই। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, ১ মে থেকে শুরু হওয়া অভিযানে এ পর্যন্ত ১২৬ জন চাঁদাবাজ ও ২১৭ জন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক আশ্রয়দাতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় জনমনে অস্বস্তি কাটছে না।
অপরদিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কমিটিকে কেন্দ্র করে সারাদেশে বিক্ষোভ ও অবরোধ বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে।
সরকারকে দ্বিমুখী চাপে রাখতে চায় জামায়াত, দলে মনোযোগ এনসিপির
দিনের প্রকাশিত সংবাদ বলছে, প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী বিএনপি সরকারকে চাপে রাখতে দ্বি-মুখী কৌশল গ্রহণ করেছে। দলটির লক্ষ্য সংসদ এবং রাজপথ; উভয় জায়গাতেই নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান জানান দেওয়া।
জামায়াতের পরিকল্পনার মূল দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে কেবল বর্জন বা ওয়াকআউটে সীমাবদ্ধ না থেকে জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জোরালো বিতর্ক ও গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সংসদকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু করা। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন। বিশেষ করে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশ এবং অক্টোবরে ঢাকায় মহাসমাবেশের পরিকল্পনা রয়েছে।
অপরদিকে এনসিপি ধারাবাহিকভাবে দলগুছানোর কাজ করে যাচ্ছে। এনসিপির দাবি, ক্ষমতাশীন দল বিএনপির বহুলোক তাদের দলে যোগদান করতে যাচ্ছে। যা রাজনৈতিক মহলে কৌতুহলের জন্ম দিচ্ছে।
দিনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপি সরকার প্রশাসনিক রদবদল ও ডিসিদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে অর্থনৈতিক সংকট (মূল্যস্ফীতি) এবং দলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা তাদের জন্য বড় ভাবমূর্তি সংকট তৈরি করছে। অন্যদিকে, সংরক্ষিত নারী আসনের কোটিপতিদের প্রাধান্য দলের তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।
বৃহস্পতিবারের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করছে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন কেবল প্রশাসনিক নির্দেশের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ, দলীয় কর্মীদের শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।









