মালিকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও বিপুল ঋণখেলাপি থাকলেও কোনো কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়া যাবে না বলে সাফ জানালেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার যুক্তি, একটি কোম্পানির মালিকের অপরাধের দায় কোম্পানির ওপর চাপানো যাবে না। কারণ, ওই প্রতিষ্ঠানে মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে, ঋণ ও দায় রয়েছে এবং অর্থনীতিতে তার অবদান রয়েছে। ফলে ব্যক্তির দুর্নীতির বিচার চলবে, কিন্তু কোম্পানির কার্যক্রমও চলতে দিতে হবে। অর্থমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে এস আলম গ্রুপের বিপুল ঋণ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ আলোচনা হয়।
সম্পূরক প্রশ্নে আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ঋণখেলাপির দেশ। তিনি এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ারের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তার প্রশ্ন ছিল, এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বর্তমানে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ থাকার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে এসএস পাওয়ারকে ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ ডলারের এলসি খোলার অনুমতি দিয়েছে।
তিনি জানতে চান, এসব ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে নিলামে তুলে দেওয়া বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করে বিশেষ ঋণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না। এর মাধ্যমে ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করা এবং বিদেশি ঋণদাতাদের নিরুৎসাহিত করার আশঙ্কাও রয়েছে কি না, জানতে চান তিনি।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক খাত পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নীতি রয়েছে। ব্যক্তির পরিচয় আর প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এক নয়।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে, তাকে জেলে দেওয়া যাবে, এমনকি আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তিও হতে পারে। কিন্তু কোম্পানি একটি পৃথক আইনি সত্তা। ব্যক্তির অপরাধের কারণে কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া যাবে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কোম্পানি একটি লিগ্যাল বডি। কোম্পানিকে আলাদা করে কোম্পানির কার্যক্রম চলতে দিতে হবে, সেটা যে কোম্পানিই হোক।’
তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তির কারণে একটি কোম্পানি বন্ধ করে দিলে সেখানে কর্মরত মানুষের চাকরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে ওই কোম্পানির ঋণ ও অন্যান্য দায় পরিশোধের বিষয় রয়েছে। অর্থনীতিতে কোম্পানিটির অবদানও বিবেচনায় নিতে হবে।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, ‘ওই কোম্পানির যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। তাদের ব্যক্তিগত দুর্নীতির জন্য বিচার হবে।’
তবে এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপুল ঋণের প্রসঙ্গে সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রীর এই অবস্থানকে সরকারের নীতিগত অবস্থান হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, প্রশ্নটি ছিল দেশের অন্যতম আলোচিত ঋণখেলাপি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে। বিপুল ঋণ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পক্ষে অর্থমন্ত্রীর যুক্তি এ বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আইন ভঙ্গ করে কাউকে ঋণ দিচ্ছে না বলেও দাবি করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেখানে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ রয়েছে, সেখানে আইনের আওতায় সেই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
তার ভাষ্য, ‘আইনের পরিপ্রেক্ষিতে সে সুযোগ যে কোম্পানিগুলো নিতে পারে, তারা নেবে। যারা নিতে পারবে না, তারা নেবে না।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, কোম্পানির মালিক বা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার বিচার চলবে। কিন্তু ব্যক্তিগত দুর্নীতির কারণে কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
এদিকে সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের প্রশ্নে উঠে আসা এসএস পাওয়ার ও এস আলম গ্রুপের ঋণের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিপুল খেলাপি ঋণের পরও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালু রাখার সুযোগ দেওয়া হলে তা অন্য ঋণখেলাপিদের জন্য কী বার্তা দেবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল যুক্তি হচ্ছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং কোম্পানির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখা দুটি পৃথক বিষয়। অর্থমন্ত্রীর মতে, ব্যক্তির অপরাধের বিচার করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলে কর্মসংস্থান, ঋণ পরিশোধ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আবেগের ওপর অর্থনীতি চলে না। আইনের ওপর অর্থনীতি চলতে হবে।’
তবে এস আলম গ্রুপের মতো বহুল আলোচিত ঋণখেলাপি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কোম্পানি ও মালিককে আলাদা করে দেখার এই অবস্থান কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে বিপুল অঙ্কের ঋণখেলাপির পরও প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, আমানতকারীদের স্বার্থ এবং ঋণ পরিশোধের দায় কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর চেয়েছেন সংসদ সদস্যরা।
অর্থমন্ত্রী অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগে কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার চলবে। একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী যেসব প্রতিষ্ঠান পুনঃতফসিলের সুযোগ পাবে, তারা সেই সুযোগ নিতে পারবে।
ফলে সংসদে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে একদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিচার চলার আশ্বাস থাকলেও অন্যদিকে ঋণখেলাপি ও বিতর্কিত মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বন্ধ না করার নীতির কথাই জোর দিয়ে উঠে এসেছে। আর এস আলমের ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের প্রসঙ্গে এই অবস্থানই এখন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।