স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘সন্ধান চেয়ে’ পোস্টার, প্রশ্নের মুখে দেশের আইনশৃঙ্খলা

সাধারণত কোনো মানুষ নিখোঁজ হলে তাঁর সন্ধান চেয়ে পোস্টার সাঁটানো হয়। সেই পরিচিত দৃশ্যই এবার রাজধানীর দেয়াল ও বৈদ্যুতিক খুঁটিতে দেখা গেল অন্য এক ব্যতিক্রমী রূপে। পোস্টারে নিখোঁজ ব্যক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ছবি। ওপরে বড় করে লেখা ‘সন্ধান চাই’। নিচে তাঁর বয়স, উচ্চতা, গায়ের রং ও পোশাকের বর্ণনা দিয়ে লেখা হয়েছে, ‘তুমি ফিরে আসো। কেউ তোমাকে কিছু বলবে না।’
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাওয়া এসব পোস্টার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে হাস্যরস। তবে হাসির আড়ালে পোস্টারটির ভাষায় যে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীর ‘সন্ধান’ চাওয়ার মধ্য দিয়ে মূলত তাঁর দৃশ্যমান ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অর্থাৎ মন্ত্রী নিখোঁজ নন, কিন্তু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তাঁর উপস্থিতি ও কার্যকর ভূমিকা কোথায়—পোস্টারটি যেন সেই প্রশ্নই করছে।
পোস্টারের শেষ লাইনে লেখা হয়েছে, ‘তুমি ফিরে আসো। কেউ তোমাকে কিছু বলবে না।’ নিখোঁজ ব্যক্তিকে আশ্বস্ত করার প্রচলিত ভাষাকে এখানে ব্যঙ্গের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ, নিরাপত্তাহীনতা ও সরকারের প্রতি হতাশা থাকলে এমন একটি পোস্টার কেন সহজেই মানুষের নজর কাড়ে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
কারা এসব পোস্টার সাঁটিয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও এর দায় স্বীকারের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকে কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচি বলার সুযোগ নেই। তবে পোস্টারটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি পরিসংখ্যানই নানা প্রশ্ন তৈরি করছে।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে—এই তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যা মামলা হয়েছে। মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮ এবং মে মাসে ৩১০টি মামলা হয়। অর্থাৎ তিন মাসে গড়ে প্রতিদিন ১০টির বেশি হত্যা মামলা হয়েছে।
তবে সংখ্যাটি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। গত বছরের একই তিন মাসে হত্যা মামলা হয়েছিল ৯৯৩টি। এর মধ্যে ২২৬টি ছিল আগের সময়ের ঘটনার জের। ফলে সরাসরি ৯১৫ ও ৯৯৩-এর তুলনা করলে প্রকৃত প্রবণতা বোঝা যাবে না। চলতি বছরের সংখ্যাটি অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণ হলেও এর সঙ্গে মামলার সময় ও ঘটনার সময়ের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
শুধু হত্যা নয়, ছয় মাসের অপরাধের হিসাবেও উদ্বেগের জায়গা রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সাত ধরনের অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মোট ২১ হাজার ৭৫৬টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে এ সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ২২৮। অর্থাৎ মোট মামলা বেড়েছে ৫২৮টি, প্রায় আড়াই শতাংশ।
এই সময় হত্যা মামলা হয়েছে ১ হাজার ৭৮৯টি, আগের ছয় মাসে ছিল ১ হাজার ৭৮০টি। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা নারী ও শিশু নির্যাতন। ছয় মাসে এ ধরনের ১১ হাজার ৬৬৫টি মামলা হয়েছে, আগের ছয় মাসে যা ছিল ১০ হাজার ৯০টি। অর্থাৎ ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৫৭৫টি।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। ছয় মাসে এ ধরনের ৩১৭টি মামলা হয়েছে, আগের ছয় মাসে ছিল ২৭৫টি। তবে ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ ও চুরির মতো কয়েকটি অপরাধের মামলা কমেছে। ফলে অপরাধের সামগ্রিক চিত্র একমুখী নয়। কিছু অপরাধ কমলেও হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার মতো গুরুতর অপরাধে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
হত্যার পরিসংখ্যানেও একই ধরনের মিশ্র চিত্র পাওয়া যায়। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ৯১৫টি হত্যা মামলা হলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রকৃত নতুন ঘটনার সংখ্যা হিসাব করতে আগের ঘটনার জের বাদ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যেও রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা উঠে এসেছে। মার্চে ১১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও ৯১২ জন আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। এপ্রিলে ৯৮টি ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ৫৩৩ জন আহত এবং মে মাসে ৬৪টি ঘটনায় পাঁচজন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
এ ধরনের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি সংঘবদ্ধ অপরাধের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সর্বশেষ বৈশ্বিক ‘অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স’-এ বাংলাদেশ ১৯৩ দেশের মধ্যে ৮৩তম অবস্থানে রয়েছে। ২০২৩ সালের সূচকে অবস্থান ছিল ৮৯তম। মানব পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, মাদক, নকল পণ্য ও আর্থিক অপরাধের মতো কয়েকটি ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা বেড়েছে বলে ওই সূচকে উঠে এসেছে।
সরকারের দাবি, পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে
অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য হলো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং বড় ধরনের অপরাধের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের কয়েকটি ঘটনায় ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আসামি গ্রেপ্তারের উদাহরণও দিয়েছেন তিনি। রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান জোরদার এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারের বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার কোনো স্বীকৃতি নেই।
সমস্যাটি হচ্ছে, সরকারের সাফল্যের হিসাব আর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধের হিসাব সব সময় এক হয় না।
একজন মানুষ রাতে বাড়ি ফেরার সময় কতটা নিরাপদ বোধ করছেন, একজন ব্যবসায়ী চাঁদাবাজির চাপ থেকে কতটা মুক্ত, কোনো নারী একা রাস্তায় চলতে কতটা নিশ্চিন্ত এবং অপরাধী রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে আইনের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে পারছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র নির্ধারণ করে।
বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি আলাদা করে ভাবতে হবে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের হিসাবের সঙ্গে আগের ছয় মাসের তুলনায় এ ধরনের মামলায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি নিরাপত্তা ও বিচার পাওয়ার পরিবেশ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
এর সঙ্গে রয়েছে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির প্রবণতা। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা বেড়ে গেলে তা শুধু অপরাধের বিষয় থাকে না, রাষ্ট্রের বিচার ও আইন প্রয়োগব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার প্রশ্নও সামনে আসে। সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনও মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘাটতির কথা বলেছিল।
সব মিলিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র এমন নয় যে সব অপরাধই বেড়ে গেছে। আবার এমনও নয় যে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। বরং সরকারি তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, কয়েকটি গুরুতর অপরাধে চাপ রয়ে গেছে, কিছু ক্ষেত্রে তা বেড়েছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই রাজধানীর দেয়ালে ‘সন্ধান চাই’ পোস্টার আলাদা মাত্রা পেয়েছে। স্পষ্টতই এতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষ যখন উদ্বিগ্ন, তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃশ্যমান নেতৃত্ব কোথায়?









