সরকারি চাকরিজীবিদের বেতন-ভাতায় লম্বা লাফ, সর্বোচ্চ ১.৫৬ লাখ

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন গ্রেডে ২০ হাজার টাকা। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকর ধরা হলেও বর্ধিত মূল বেতন একবারে নয়, তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। আর বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকের পর প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনি জানান, অনুমোদিত পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন চলতি সপ্তাহেই জারি করা হবে। এ জন্য একটি নয়, একাধিক প্রজ্ঞাপন জারি হবে। আইনগত ভেটিং শেষে কয়েকটি বিষয় স্ট্যাটুটরি রেগুলেটরি অর্ডার (এসআরও) আকারেও জারি করা হবে।
মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, সর্বশেষ ২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেল দেওয়া হয়েছিল। এরপর প্রায় ১২ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল হয়নি। নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। এসব নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও অবসর-পরবর্তী সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বিস্তারিত বিধান থাকবে।
সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার
নতুন জাতীয় বেতন স্কেলেও সরকারি চাকরিতে ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডের বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন আগের তুলনায় ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে।
তবে এই বেতন বৃদ্ধি একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে।
একসঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন এবং এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সব গ্রেডে মোবাইল ভাতা
নতুন পে স্কেলে ভাতার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানো। এখন ১ম থেকে ২০তম—সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন।
আগের বেতন কাঠামোয় নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মচারীরা, বিশেষ করে পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত, এ সুবিধার আওতায় ছিলেন। নতুন ব্যবস্থায় সেই সীমা তুলে দিয়ে সব গ্রেডের কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনা হচ্ছে।
কম পেনশনভোগীদের বেশি সুবিধা
নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় পুরোনো পেনশনভোগীদের জন্যও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন (ওআরওপি) ব্যবস্থা এখনই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি এবং এর জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এর পরিবর্তে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বেশি হারে সুবিধা দেওয়ার নতুন ফর্মুলা অনুমোদন করা হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন আগে অবসর নেওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা বেশি সুবিধা পাবেন।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—
৯ হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশন হলে বাড়বে ১০০ শতাংশ;৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন হলে বাড়বে ৭৫ শতাংশ;
২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৬৫ শতাংশ;
৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৬০ শতাংশ;
৪০ হাজার ১ টাকা বা এর বেশি হলে বাড়বে ৫৫ শতাংশ।
অর্থাৎ, যাদের পেনশন তুলনামূলক কম, নতুন ব্যবস্থায় তাদের পেনশন বৃদ্ধির হারও তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে।
প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেলে প্রথমবারের মতো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য আলাদা মাসিক ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারী মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের অতিরিক্ত পরিচর্যা এবং পরিবারের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
একাধিক প্রজ্ঞাপন, চলতি সপ্তাহেই
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখন শুরু হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহেই এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হবে। তবে পে স্কেলের জন্য একটি মাত্র গেজেট নয়, একাধিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
আইনগত ভেটিং শেষ করে কয়েকটি বিষয় এসআরও আকারেও জারি করা হবে। অর্থ বিভাগ এসব প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনার মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিস্তারিত নিয়ম জানাবে।
নতুন কাঠামোয় শুধু মূল বেতন নয়, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী সুবিধার বিষয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা থাকবে। পাশাপাশি সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাকে অনুমোদিত বেতন স্কেল যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হবে।
তিন ধাপে বেতন, পরে ভাতা
সার্বিকভাবে নতুন পে স্কেলের মূল কাঠামো কার্যকর ধরা হচ্ছে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে। তবে কর্মচারীদের হাতে পুরো বর্ধিত মূল বেতন পৌঁছাবে ধাপে ধাপে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হবে।
অন্যদিকে বিভিন্ন ভাতা একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। ফলে নতুন পে স্কেলের পূর্ণ আর্থিক প্রভাব ধীরে ধীরে সরকারি কর্মচারীদের আয়-সুবিধায় প্রতিফলিত হবে।
প্রায় এক যুগ পর নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদনের ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ও অবসর-পরবর্তী সুবিধার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এখন প্রজ্ঞাপন জারির পরই স্পষ্ট হবে নতুন কাঠামোর প্রতিটি ধাপের বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও আর্থিক সুবিধার বিস্তারিত হিসাব।









