সম্পাদকদের নতুন জোট, নেতৃত্বে শফিক রেহমান ও মাহমুদুর রহমান
১৭ বছরের ‘কলঙ্কিত অধ্যায়’ পেরিয়ে নতুন ঐক্য

সম্পাদকদের ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)। নতুন এ যাত্রায় সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।
সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির প্রথম সাধারণ সভায় অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। সভায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রকাশিত ২৯টি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক অংশ নেন।
সাধারণ সভায় সম্পাদকদের মতামতের ভিত্তিতে কিছু সংশোধনীসহ এনইসির গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়। একই সঙ্গে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার পেশাগত মানোন্নয়ন এবং সম্পাদকদের ঐক্য জোরদারে সংগঠনটির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলমকে কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত করা হয়েছে।
শফিক রেহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সম্পাদকরা গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং পেশাগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। সভায় আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলকে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য সম্পাদকরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেন।
তিনি বলেন, সংগঠনটি প্রথম সভাতেই গণতান্ত্রিকভাবে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যাত্রা শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সম্পাদকদের এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার মাধ্যমে এনইসিকে একটি বৃহত্তর জাতীয় সংগঠনে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে।
মাহমুদুর রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শত শত মানুষ শহীদ হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরে এসেছে। এখন সাংবাদিকদের শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে হবে।
সভায় গত দেড় দশকের সাংবাদিকতার পরিস্থিতি নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন কয়েকজন সম্পাদক। যুগান্তর সম্পাদক আব্দুল হাই শিকদার বলেন, গত ১৭ বছরে সাংবাদিকতার নামে গণমাধ্যমে যা হয়েছে, তা ছিল একটি ঘৃণ্য অধ্যায়। তার ভাষায়, সংবাদমাধ্যম পচে-গলে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এখন সেখান থেকে উত্তরণের চেষ্টা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, উপমহাদেশে গণমুখী সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ধূমকেতুর মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন। নজরুল ইসলাম নিজেও একজন সফল সম্পাদক ছিলেন।
আব্দুল হাই শিকদারের প্রস্তাবের পর প্রতিবছর সাংবাদিকতায় ‘নজরুল পদক’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল।
পিপলস ভিউ সম্পাদক ওসমান গনি মনসুরও গত ১৭ বছরের সাংবাদিকতার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকতার নামে ওই সময়ে যা হয়েছে, তা একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে আছে।
ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে সম্পাদকদের এমন একটি প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন ছিল। এনইসিকে যেন সারা বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর হিসেবে গড়ে তোলা যায়, সেজন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে শফিক রেহমান বলেন, দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ থেকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সারা দেশের সম্পাদকদের একটি প্ল্যাটফর্মে আনতে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
সাধারণ সভায় অংশ নিয়ে আরও বক্তব্য দেন নয়া দিগন্ত সম্পাদক সালাহ উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান, নিউ নেশন সম্পাদক মোকাররম হোসেন, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক লোটন একরাম, মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, খবর সংযোগ সম্পাদক শেখ নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশের খবরের সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন, ভোরের ডাক সম্পাদক কে এম বেলায়েত হোসেন, জনতা সম্পাদক ওবায়দুর রহমান শাহীন, দ্য বাংলাদেশ পোস্ট সম্পাদক সদরুল হাসান, বাণিজ্য প্রতিদিন সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন, খোলা কাগজ সম্পাদক মনির হোসেন, রূপালী বাংলাদেশের সায়েম ফারুকী, ভোরের বাংলা সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ আরিফ, দি গ্লোবাল পোস্টের ড. মাহবুবুর রহমান, নওরোজ সম্পাদক শামসুল হক দুররানি, কর্ণফুলী সম্পাদক আফসার উদ্দিন চৌধুরী, দৈনিক লোকসমাজের সম্পাদক শান্তুনু ইসলাম, নতুন প্রভাতের সম্পাদক সোহেল মাহবুব, দৈনিক নিউটাইমসের সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক মুকতাবিস উন নুর, যুগের চিন্তার সম্পাদক মোরছালীন বাবলা, দৈনিক প্রবাহ সম্পাদক মো. আশরাফ এবং বাংলাদেশ বাণীর সম্পাদক আযাদ আলাউদ্দীন।
সভায় উপস্থিত সম্পাদকরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার পেশাগত মানোন্নয়নে নিজেদের পরামর্শ তুলে ধরেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্পাদকদের একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পক্ষে সম্মিলিত ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।
নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল এখন দেশের সম্পাদকদের একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রথম সাধারণ সভায় দেওয়া বক্তব্যে সংগঠনটির নেতৃত্ব স্পষ্ট করেছে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সম্পাদকদের পেশাগত অধিকার এবং গণমাধ্যমের মানোন্নয়নই হবে তাদের মূল অগ্রাধিকার।









