ঢাকার ‘বোতলনেক’ খুলতে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত, টার্মিনাল-মার্কেট সরানোর সিদ্ধান্ত

রাজধানীর যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ও পণ্যবাহী পরিবহনের চাপ কমাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর এবং কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গাবতলী বাস টার্মিনাল সম্প্রসারণ, এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) চালু, অটোরিকশা চলাচলে পৃথক নীতিমালা এবং অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে ঢাকা মহানগরীর চলমান যানজট, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফ্লাইওভারে যানবাহনের চাপ, গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা, বাস টার্মিনাল, পার্কিং ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হবে। এ জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ করে স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণে সময় লাগবে বলে এর আগেই অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ঝিলমিল প্রকল্পের ১৫ একর জমিতে আগামী চার মাসের মধ্যে একটি অস্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এর ফলে ঢাকার কেন্দ্রীয় অংশে আন্তজেলা বাস ও অন্যান্য যানবাহনের চাপ কমানোর পাশাপাশি ফুলবাড়িয়া এলাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গাবতলীতে বাড়বে টার্মিনালের পরিসর
ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল সরানোর পাশাপাশি গাবতলী বাস টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য টার্মিনালের পেছনের অংশ সম্প্রসারণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোকে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সড়ক বিভাগ, ট্রাফিক পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে এ কাজ বাস্তবায়ন করবে।
সরকারের পরিকল্পনায় ঢাকার প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে গণপরিবহনের চাপকে নির্দিষ্ট টার্মিনালকেন্দ্রিক করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আন্তজেলা বাসের অপ্রয়োজনীয় চলাচল কমানো সম্ভব হবে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।
কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট যাবে গাবতলীতে
রাজধানীর যানজট কমাতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট স্থানান্তরের বিষয়ে। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এই এলাকায় পাইকারি বাজার, পণ্যবাহী যানবাহন ও ক্রেতাদের চাপ রয়েছে।
বৈঠকে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কিচেন মার্কেট স্থানান্তর করা হলে কারওয়ান বাজার এলাকায় পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ কমবে এবং আশপাশের সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হবে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।
যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারে বুয়েটের ১৫ দিনের সময়
রাজধানীর আরেকটি বড় যানজটপ্রবণ এলাকা যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার। এ এলাকার যানজট নিরসনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের আগে তৈরি করা প্রতিবেদন পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বুয়েটকে বিদ্যমান প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ নতুন একটি প্রতিবেদন আগামী ১৫ দিনের মধ্যে জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চার মাসে টোল প্লাজায় ইটিসি
ঢাকার যানজট নিরসনের উদ্যোগের সঙ্গে টোল আদায় ব্যবস্থাপনাকেও যুক্ত করা হয়েছে। এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোল প্লাজাগুলোতে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন বা ইটিসি ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ ব্যবস্থায় যানবাহনকে টোল দেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে না। প্রযুক্তিনির্ভর টোল আদায়ের মাধ্যমে টোল প্লাজায় যানবাহনের জট কমানোর পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াকে দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ জন্য একটি অ্যাপও তৈরি করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগামী চার মাসের মধ্যে অ্যাপসহ ইটিসি ব্যবস্থা চালুর কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সচিবালয়ের চারপাশে পার্কিংয়ের চাপ কমানোর উদ্যোগ
সচিবালয়ের আশপাশের সড়কে যানজটের অন্যতম কারণ যানবাহনের পার্কিং। এ চাপ কমাতে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প পার্কিংয়ের স্থানও অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে। সচিবালয়কেন্দ্রিক যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং আশপাশের সড়কে চলাচল স্বাভাবিক রাখাই এর লক্ষ্য।
অটোরিকশার জন্য পৃথক নীতিমালা
ঢাকা শহরে অটোরিকশা চলাচলকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল করতে পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অটোরিকশার চলাচল, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে এই নীতিমালা করা হবে। এর মাধ্যমে রাজধানীতে অটোরিকশা চলাচলকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অনুমোদনহীন স্লিপার বাসে ব্যবস্থা
অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার বাসের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর যানজট নিরসনে দীর্ঘদিন ধরে সড়ক সম্প্রসারণ, উড়ালসড়ক নির্মাণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও যানবাহনের চাপ, অপরিকল্পিত পার্কিং, আন্তজেলা বাসের নগরকেন্দ্রিক চলাচল এবং পাইকারি বাজারের কারণে বিভিন্ন এলাকায় যানজট স্থায়ী রূপ নিয়েছে। এবারের বৈঠকের সিদ্ধান্তে এসব ‘বোতলনেক’ বা সংকটপূর্ণ জায়গায় যানবাহন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের চাপ সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।









