সংসদে তীব্র বাকযুদ্ধ, ওয়াকআউট করে সংসদ ছাড়ল বিরোধীরা
নানা সংকটে সরকারের সমালোচনা

বিদ্যুৎ-গ্যাস ও জ্বালানি সংকট, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে বিরোধী দল। এসব ইস্যুতে বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সরকারের মন্ত্রীদের তীব্র বাকযুদ্ধের একপর্যায়ে ওয়াকআউট করে সংসদ থেকে বেরিয়ে যান বিরোধী দলের সদস্যরা।
এসময় সংসদকে কার্যকর রাখতে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়ে তাদের ওয়াকআউট না করার অনুরোধ করেন স্পিকার। তবে সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে কক্ষ ত্যাগ করেন বিরোধী সংসদ সদস্যরা।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে এসব ঘটনা ঘটে।
অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জাতীয় জীবনের সমসাময়িক নানা সংকট তুলে ধরে সরকারের জবাবদিহি দাবি করেন। তিনি বলেন, দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে শত শত কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে শিল্প মালিকদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়ে অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে। একই সঙ্গে অনভিপ্রেত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পাশাপাশি অতিরিক্ত ‘ভুতুড়ে বিল’ পরিশোধ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
জ্বালানি সংকট নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাও সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ রসিকতা করে বলছে—বিদ্যুতের পরিস্থিতি এখন ‘টুকু আসে, টুকু যায়’। একদিকে তেলের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জন্য মানুষকে হাহাকার করতে হচ্ছে।
বাজার পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে রুমিন বলেন, বাজারে ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। টিসিবির ট্রাকের পেছনে দীর্ঘ লাইন মানুষের সীমাহীন কষ্টের সাক্ষ্য দিচ্ছে। সরকার এক কোটি কর্মসংস্থানের কথা বললেও ইতোমধ্যে ৬২ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং ৯০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারকে কটাক্ষ করেন রুমিন। তিনি বলেন, দেশে ৬৪টি জেলায় ৬৪ জন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলেও হয়তো পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসত। জনভোগান্তি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের উদাসীনতাকে আড়াল করতেই মন্ত্রীরা সংসদের ভেতরে বাকচাতুরি করছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের তীব্র জনদুর্ভোগ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে এর আগে রাষ্ট্রপতি ও স্পিকারের কাছে জরুরি অধিবেশন আহ্বানের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গণভোটের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে জনগণের রায় পাওয়া গেলেও সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করা হয়নি। এতে জনগণের দেওয়া মূল রায়কে পাশ কাটানো হয়েছে। স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ সংস্কার ও নির্বাচনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি অর্ডিন্যান্স ল্যাপস বা নিষ্ক্রিয় হতে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এসব গুরুত্বপূর্ণ আইনি সংস্কার কার্যকর না থাকায় সমাজে আবারও পুরোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা মাথাচাড়া দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নতুন সংসদের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়েও আপত্তি জানান শফিকুর রহমান। তার দাবি, বৃহস্পতিবারের অধিবেশনটি সংসদীয় রীতি অনুযায়ী ‘বেসরকারি সদস্য দিবস’ হলেও সাধারণ সংসদ সদস্যদের আনা নোটিশ ও বেসরকারি বিলকে পাশ কাটিয়ে সরকারি বিল উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আনা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট চারটি গুরুত্বপূর্ণ নোটিশ নিয়ে আলোচনা না হওয়ায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
এসব বক্তব্যের একপর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুরু থেকেই বিরোধী দলের সদস্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে অসংসদীয় মনোভাব দেখিয়ে আসছেন। সংসদকে নিজের শ্রেণিকক্ষ ভেবে সবাইকে ছাত্রের মতো শাসন করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ ধরনের আচরণকে ‘সংসদীয় ফ্যাসিবাদ’ আখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ দাবি করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
বিরোধীদের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তুচ্ছ বাহানায় কথায় কথায় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করলে গণতন্ত্রেরই ক্ষতি হবে। সংসদকে কার্যকর করতে না পারলে গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খাবে এবং এর দায় ইতিহাস বিরোধী দলের ওপরও বর্তাবে।
তিনি বলেন, রাজপথে বা গুলশানে অনেক কথা বলা সম্ভব হলেও সংসদের ভেতরে কথা বলতে হবে নির্দিষ্ট বিধি মেনে এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। আইন প্রণয়নসহ দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটের সমাধান জাতীয় সংসদেই হওয়া উচিত।
বিরোধী দলের ওয়াকআউটের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইন প্রণয়ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা না করার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এই ওয়াকআউট করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে বিরোধীদের দাবির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তৈরি মানবাধিকার কমিশন আইনের ভুলত্রুটি সংশোধনে আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টরা কাজ করেছেন। দেশি-বিদেশি অংশীজন, কূটনৈতিক মিশন, মানবাধিকার সংস্থা ও ইউএনডিপির সঙ্গে আলোচনা করে নতুন বিল প্রস্তুত করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল সংসদে উত্থাপন করে কমিটিতে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু এসব বিল উত্থাপনকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের সংসদ ত্যাগ করা দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের সময় সদস্যদের হট্টগোল ও পরস্পরকে বাধা দেওয়ার ঘটনায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সংসদের ভেতরে সদস্যদের অসহিষ্ণুতা এবং স্পিকারের নির্দেশ অমান্যের এই ধারা অব্যাহত থাকলে সংসদের ভবিষ্যৎ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
বক্তব্যে অসংসদীয় শব্দ থাকলে তা পরীক্ষা করে কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার কথা জানিয়ে স্পিকার বলেন, কিন্তু কাউকে কথা বলতে না দিয়ে সমস্বরে চেঁচামেচি করা কোনো সুস্থ সংসদীয় রীতি হতে পারে না। নিজের দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষকে পরমতসহিষ্ণু হওয়ার আহ্বান জানান।
একপর্যায়ে স্পিকার বিরোধীদলীয় সদস্যদের কক্ষ থেকে বের না হওয়ার অনুরোধ করেন। তবে সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।
পরে জ্বালানি সংকটের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত ও একক গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে তৈরি সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের দাম বাড়লেও দেশের বাজারে তা সহনীয় রাখার চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, জরুরি ভিত্তিতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিল্প ও সার কারখানার উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় এবং দ্রব্যমূল্যের ওপর চাপ কমে, সে লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে বিরোধী দলের দাবি, জনগণের দুর্ভোগ কমাতে আশ্বাস নয়, এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে জনঅসন্তোষ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।







