মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের ‘আগ্রহ’, নজরদারিতে রাখছে দিল্লি
রণধীর জয়সওয়াল

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার আগ্রহের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। নয়াদিল্লির ভাষ্য, পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এবং নতুন এই প্রতিরক্ষা কাঠামো আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তায় কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার নয়াদিল্লিতে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ অবস্থানের কথা জানান।
সম্প্রতি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কায় স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তির পর বাংলাদেশও এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দেশের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় রেখে এ ধরনের উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি ঢাকা খোলা মনে বিবেচনা করছে। তাঁর এ বক্তব্যের পরই ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এলো।
শুক্রবারের সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়ে জানতে চাইলে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় ঘটে চলা ঘটনাবলির ওপর ভারত নিবিড়ভাবে নজর রাখছে। নির্দিষ্টভাবে মক্কা চুক্তির প্রভাবের বিষয়ে তিনি জানান, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভারতের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি জোর দেন।
কী আছে মক্কা চুক্তিতে
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ৭ আগস্ট মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে চুক্তিটি তিন দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
চুক্তির পর তুরস্কের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোকে এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। ফলে মক্কা চুক্তি কেবল তিন দেশের মধ্যকার একটি প্রতিরক্ষা সমঝোতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় রূপ নেবে—তা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই কাঠামোর প্রতি আগ্রহ দেখানোর বিষয়টি তাই ভারতের কাছে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রশ্ন হিসেবে দেখা হচ্ছে না; এর সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার বৃহত্তর কৌশলগত সমীকরণও জড়িয়ে রয়েছে। ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোও বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে দেশটির পররাষ্ট্রনীতির নতুন কৌশলগত অভিমুখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছে।
ঢাকার অবস্থান জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক
মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ঢাকার বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট দেশের পক্ষ নেওয়ার চেয়ে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করেই বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নিতে চায়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় দেশের নিজস্ব স্বার্থই হবে প্রধান বিবেচনা। এ অবস্থান থেকে স্পষ্ট, ঢাকার কাছে বিষয়টি কেবল ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কোনো জোটে যুক্ত হওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং পরিবর্তিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণের একটি কৌশলগত বিষয়।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন সমীকরণ
বাংলাদেশের সম্ভাব্য মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আলোচনা এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নতুন করে সমীকরণ তৈরির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুই দেশই সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বললেও শেখ হাসিনাকে ঘিরে প্রত্যর্পণসহ বিভিন্ন বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।
এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও আলোচনা চলছে। শুক্রবারের ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জয়সওয়াল বলেন, এ মুহূর্তে নতুন কোনো তথ্য দেওয়ার মতো নেই। সফরের কর্মসূচি চূড়ান্ত হলে তা গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
ফলে একদিকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফর—দুই বিষয়ই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সামনে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ইস্যু—গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামো ও যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে আলোচনা করা হচ্ছে।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এর নবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কারিগরি ও কূটনৈতিক আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চলতি বছর যৌথ নদী কমিশনের ৯০তম বৈঠকেও গঙ্গার পানি প্রবাহ ও চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সব মিলিয়ে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের আগ্রহ, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর এবং গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন—এই তিনটি বিষয় একই সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে নতুন কৌশলগত বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ভারসাম্যের সন্ধান এবং ভারতের সেই পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ—আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।









