প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের আশ্বাস দিল্লির
বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বার্তা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরে তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে দিল্লি। একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্যে বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতা কমিয়ে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত করার তাগিদ দিয়েছে ঢাকা। পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা ও ভারতের শিল্প ও ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) সফররত প্রতিনিধিদলের সম্মানে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তাঁরা। এর আগে সিআইআই প্রতিনিধিদলটি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত ভৌগোলিকভাবে প্রতিবেশী, সামাজিকভাবে ঘনিষ্ঠ এবং অর্থনৈতিকভাবে পরস্পরের পরিপূরক। দুই দেশের বাণিজ্য বাড়লেও এর মধ্যে এখনো কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে বিদ্যমান বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করতে উভয় পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, শুল্কবহির্ভূত বাধা, পণ্য পরীক্ষা ও মান নির্ধারণের জটিলতা, প্রক্রিয়াগত বিলম্ব এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দুই দেশের ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে বাধা হয়ে আছে। এসব সমস্যা চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধানে ভারতীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, বিশেষ করে সিআইআই প্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি পণ্য আমদানির আহ্বান জানিয়ে বলেন, তৈরি পোশাক, বস্ত্র, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, ওষুধ, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্য, সিরামিক, প্লাস্টিক ও হালকা প্রকৌশল পণ্যে দুই দেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের বড় সুযোগ রয়েছে।
আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে সার্ক ও বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের কার্যকর ব্যবহার এবং যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর প্রসঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, সফরটি হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সম্মান দেওয়া হবে। এর আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর দ্রুত হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন এবং দুই দেশের সরকারপ্রধান সরাসরি বৈঠকে বসলে অনেক অমীমাংসিত বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ত্রিবেদী বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক শর্তহীন বিশ্বাস, সম্মান ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়। ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্কের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, নতুন বাংলাদেশের চালিকাশক্তি তরুণ প্রজন্ম। বাংলাদেশের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ভারতের ‘বিকশিত ভারত’—দুই দেশের লক্ষ্যই মানুষের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক হলেও মুখোমুখি সংলাপের মাধ্যমে উদ্বেগ ও সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
তিনি বলেন, অতীতের বিষয়গুলো ভুলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদা বজায় রেখে দুই দেশকে অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে হবে।
সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক নয়; এর সঙ্গে ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মানুষের আন্তরিক যোগাযোগ জড়িত। ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বের মূল চালিকাশক্তি হবে বেসরকারি খাত, তরুণ প্রজন্ম এবং পারস্পরিক বিশ্বাস।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ব্যবসা ও শিল্প খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়িয়ে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়নে নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি আরও বলেন, পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে অতীতের মতপার্থক্য কাটিয়ে দুই দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অভিন্ন লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।
সিআইআইয়ের ১৪ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলটি ১৭ থেকে ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ সফর করছে। প্রতিনিধিদলে ভারতের বিভিন্ন খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ভারত বায়োটেক, গোদরেজ ইন্ডাস্ট্রিজ, মাহিন্দ্রা গ্রুপ, লারসেন অ্যান্ড টুবরো, নুমালিগড় রিফাইনারি, অ্যাপোলো হাসপাতাল ও ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন।
সফরকালে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও অংশীদারত্ব তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত করতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা দূর করার মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ে রাজনৈতিক বোঝাপড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থের সমন্বয়ই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফর এবং একই সময়ে ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর সেই সমীকরণে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।









