'নয় দফা' মেনে নেওয়ার খবরে তাড়াহুড়ো করে 'এক দফা'র উদ্যোগ: আব্দুল কাদের

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় 'এক দফা' ঘোষণার নেপথ্য নিয়ে চলমান বিতর্কে এবার মুখ খুলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের। দীর্ঘ এক ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, 'এক দফা' ঘোষণাকে ঘিরে পরবর্তীকালে যে বর্ণনা সামনে এসেছে, তার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ অমিল রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি নাহিদ ইসলাম ও মাহফুজ আলমের 'ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখার ফাঁদ' এবং সমন্বয়কদের ভয়ভীতি দেখিয়ে রাজি করানোর বর্ণনাও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, 'এক দফা' ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পরে যে ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে, তার সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মিল নেই।
সোমবার (৩ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের নিজস্ব অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি এসব দাবি করেন। এসময় তিনি জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা 'নয় দফা' দাবি মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন— এমন তথ্য পাওয়ার পরই 'এক দফা' ঘোষণার উদ্যোগ জোরদার হয়েছিলো। বলেন, আরও সাত-দশ দিন অপেক্ষা করলে প্রাণহানি বাড়তে পারত বলেই তিনি দ্রুত 'এক দফা' ঘোষণার পক্ষে অবস্থান নেন।
আব্দুল কাদের বলেন, ১ আগস্ট ডিবি হেফাজত থেকে ছয় সমন্বয়ক মুক্ত হওয়ার পর তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয়নি। তিনি, মাহিন সরকার, আব্দুল হান্নান মাসুদ ও রিফাত রশিদ নিজেদের উদ্যোগেই ২ আগস্টের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ডিবি থেকে ফেরা কয়েকজন সমন্বয়কের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয়। তার দাবি, ২ আগস্ট জুমার নামাজের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একটি অনলাইন বৈঠক হয়। সেখানে অধিকাংশই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। তবে 'এক দফা' ঘোষণার বিষয়ে তখনই সিদ্ধান্ত না নিয়ে আরও সাত থেকে দশ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মতামত আসে।
আব্দুল কাদেরের ভাষ্য, তিনি ওই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ছিলেন না। কারণ, মাঠের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল এবং পেশাজীবী, শিক্ষক, আইনজীবী, শিল্পীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনের সঙ্গে প্রকাশ্যে সংহতি জানাতে শুরু করেছিলেন।
স্ট্যাটাসে তিনি আরও দাবি করেন, ওই দিন সন্ধ্যায় তার বাসায় এক নারী সাংবাদিক, ওয়াহিদ আলম ও তায়সীর কাদের চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনায় 'এক দফা' ঘোষণার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পরে ছাত্রদলের নেতা নাসির, রাকিব এবং শিবিরের নেতা সাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তাদের মাধ্যমে নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের উচ্চপর্যায়ের মতামতও নেওয়া হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তার দাবি, এ সময় তিনি খবর পান যে পরদিন শেখ হাসিনা 'নয় দফা' দাবি মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এ তথ্যই তাকে দ্রুত 'এক দফা' ঘোষণার উদ্যোগ নিতে আরও উৎসাহিত করে।
আব্দুল কাদের বলেন, পরে রিফাত, মাহিন ও মাসুদের সঙ্গেও আলোচনা করে 'এক দফা' ঘোষণার খসড়া প্রস্তুত করা হয়। তার দাবি, খসড়াটি এক সাংবাদিকের সহকর্মী তৈরি করেন এবং পরে ওয়াহিদ আলম সম্পাদনা করেন। তিনি নিজেও ঘোষণার একটি ভিডিও ধারণ করেছিলেন।
তবে শেষ মুহূর্তে রিফাত ও অন্যরা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন বলে দাবি করেন আব্দুল কাদের। তার ভাষ্য, তারা জানান যে নাহিদ ইসলামদের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং পরদিন তারাই 'এক দফা' ঘোষণা করবেন। এ প্রতিশ্রুতির পর তিনি নিজে আর ঘোষণাটি প্রকাশ করেননি।
স্ট্যাটাসে নাহিদ ইসলাম ও মাহফুজ আলমের পরবর্তী সময়ের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, 'এক দফা' ঘোষণার জন্য সমন্বয়কদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল বা এটি 'ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখার ফাঁদ' ছিল— এমন দাবি তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না।
তার ভাষ্য, রিফাতদের ওপর জোরপূর্বক চাপ প্রয়োগ করা হয়নি। তারা মূলত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। পরিস্থিতির চাপে এক নারী সাংবাদিক বিরক্তি প্রকাশ করে কিছু মন্তব্য করলেও সেটিকে ভয়ভীতি প্রদর্শন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে তিনি দাবি করেন।
আব্দুল কাদের আরও বলেন, যাদেরকে পরবর্তীতে 'কোয়ার্টার' বা 'ফাঁদের অংশ' বলা হয়েছে, তারাই আন্দোলনের শুরু থেকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন এবং নিজেদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিলেন। তিনি বলেন, তার উদ্দেশ্য ছিল কেবল সময়োপযোগী মুহূর্তে 'এক দফা' ঘোষণাকে এগিয়ে আনা। এর বেশি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা ষড়যন্ত্রের অংশ তিনি ছিলেন না বলে দাবি করেন।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই আন্দোলনের 'এক দফা' ঘোষণার নেপথ্য নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সামনে আসছে। আব্দুল কাদেরের এই দীর্ঘ স্ট্যাটাস সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করল।







