সীমান্তে ‘পুশইন’: ভারতকে থামার আহ্বান হিউম্যান রাইটস ওয়াচের
নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া কাউকে ঠেলে দেওয়া নয়

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে মানুষকে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলেছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনায় ভারত ও বাংলাদেশকে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
বুধবার (১৭ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, চলতি মাসের ১ জুন থেকে বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দেওয়ার অন্তত ২১টি চেষ্টা বিজিবি প্রতিহত করেছে। এসব ঘটনায় দুই শতাধিক মানুষকে সীমান্ত পার করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে বহু পরিবার সীমান্তের ‘জিরো লাইনে’ মানবেতর পরিস্থিতির মুখে পড়ছে। এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, সংস্থাটি এমন অন্তত ৯ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে, যারা দাবি করেছেন—বিএসএফ সদস্যরা গভীর রাতে বিভিন্ন দলকে কাঁটাতারের বেড়া কেটে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে কিংবা সীমান্তে ফেলে রাখছে, যা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
তিনি বলেন, ‘সরকারকে অবিলম্বে এসব ঠেলে পাঠানো বন্ধ করতে হবে এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।’
প্রতিবেদনে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও সীমান্তের কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৫ জুন পঞ্চগড় সদর সীমান্তে ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে প্রায় ৭৫ ঘণ্টা অচলাবস্থা তৈরি হয়। ওই সময় নারী-শিশুসহ কয়েকজনকে সীমান্তের জিরো লাইনে খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মধ্যে রাত কাটাতে হয় বলে স্থানীয়দের বরাতে জানিয়েছে সংস্থাটি।
একাধিক পতাকা বৈঠকের পর বিএসএফ শেষ পর্যন্ত তাদের ভারতে ফিরিয়ে নেয়।
এ ছাড়া ৬ জুন ঠাকুরগাঁও সীমান্তে দুটি পরিবারের ছয় সদস্য এবং ৮ জুন এক গর্ভবতী নারী ও তার শিশুসহ ১১ জন প্রায় ৪৮ ঘণ্টা জিরো লাইনে আটকা ছিলেন। পরে বিএসএফ তাদেরও ফিরিয়ে নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, পশ্চিমবঙ্গে মার্চের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে ৯০ লাখের বেশি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়। এরপর অনেকের মধ্যে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়।
প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির সমালোচনা করে বলা হয়, এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে বহু মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি দাবি করেন, তার সরকারের এই নীতির আওতায় শত শত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে’ শনাক্ত করা হয়েছে এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষকে ‘ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে’।
অন্যদিকে, ভারতের আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বক্তব্যেরও উল্লেখ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তিনি বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের নিয়ে বিভিন্ন সময় ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন।
সম্প্রতি এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সীমান্তের কাছাকাছি নিয়ে যাই এবং আক্ষরিক অর্থেই সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিই।’
মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, এ ধরনের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এদিকে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া সীমান্তে কাউকে ঠেলে দিলে তাদের গ্রহণ করা হবে না। কোনো প্রত্যাবাসন হলে তা দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই করতে হবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নাগরিকত্ব যাচাই ও প্রত্যাবাসনের জন্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আটকা পড়ে মানবিক সংকটে পড়ছেন।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, কোনো মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তাকে দুই দেশের সশস্ত্র সীমান্তরক্ষীদের মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নামে যেন মানুষের মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ না হয়—ভারত ও বাংলাদেশ উভয়কেই তা নিশ্চিত করতে হবে।









