ইসলামী ব্যাংকের অর্থ নির্বাচনী তহবিলে গেছে প্রমাণ করুন, মেডেল দেব: শফিকুর রহমান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জামায়াত আমীরের ওপেন চ্যালেঞ্জ

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির অর্থ কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী তহবিলে ব্যবহার করা হয়েছে—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এমন ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁকে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি প্রমাণ করতে পারেন ইসলামী ব্যাংকের অর্থ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী তহবিলে গেছে, তাহলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে একটি মেডেল দেবেন।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে তিনি ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা, শেয়ার হস্তান্তর, ঋণ বিতরণ এবং ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেন।
জামায়াত আমির দাবি করেন, ইসলামী ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি দেশের লাখো গ্রাহক, আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারের প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা পরীক্ষানিরীক্ষা দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এর আগে আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে ৭০০ কোটি টাকার একটি ঋণ নেওয়ার পর সেই অর্থ কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী তহবিলে চলে গেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। যদিও তিনি কোনো দলের নাম উল্লেখ করেননি। তাঁর এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় শফিকুর রহমান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেসব অভিযোগ আনলেন, কোনো একটি দলের দিকে ইঙ্গিত করলেন। একেবারে নাম বলেই দিতে পারতেন—জামায়াতে ইসলামী। মাঝেমধ্যে নেকাব খোলা ভালো। এখানে নেকাব রেখে দিলেন কেন?”
এরপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “৭০০ কোটি টাকার ঋণ কে নিয়েছে, কোথায় গেছে—এসব বিষয়ে তিনি বলেছেন কোনো একটি দলের নির্বাচন ফান্ডে গেছে। আমি পরিষ্কার জানতে চাই, তিনি কি জামায়াতকে বুঝিয়েছেন? যদি বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে আমি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছি। তিনি এটা প্রমাণ করতে পারলে আমি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে একটি মেডেল দেব।”
‘এক টাকাও গেলে ব্যবস্থা নিন’
ইসলামী ব্যাংকের রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিম (আরডিএস) নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, আরডিএস কোনো রাজনৈতিক দলের প্রকল্প নয়, কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীরও নয়। এটি একটি উন্নয়নমূলক অর্থায়ন কর্মসূচি।
তিনি বলেন, “আরডিএস থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণের কথা বলা হয়েছে। আমি জানতে চাই, কে নিয়েছে এই টাকা? যদি আমি বা আমার কোনো সহকর্মী, কিংবা জামায়াতের তহবিলে এ ধরনের অর্থের এক টাকাও গিয়ে থাকে, তাহলে সার্চলাইট দিয়ে খুঁজে বের করুন এবং আমাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিন।”
‘শেয়ারহোল্ডার কীভাবে হয়েছে, সেটা তো সবাই জানে’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে শেয়ারহোল্ডারদের বিষয়ে দেওয়া মন্তব্যেরও সমালোচনা করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন—শেয়ারহোল্ডার কীভাবে শেয়ারহোল্ডার হয়েছেন, সেটা পরে দেখা যাবে। কিন্তু এ বিষয়টি তো বহু আগেই প্রকাশ্যে এসেছে।
তিনি বলেন, “সারা দুনিয়া জানে কীভাবে শেয়ার হাতবদল হয়েছে। একজন বিজ্ঞ মানুষ হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও তা জানেন। তিনি জানেন না—এটা আমি বিশ্বাস করি না।”
‘কইয়ের তেল দিয়ে কইও ভেজেছেন, শোল মাছও ভেজেছেন’
এস আলম গ্রুপের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও তাদের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তোলেন জামায়াত আমির। তিনি দাবি করেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ ব্যবহার করেই ব্যাংকের শেয়ার কিনে মালিকানা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, “এই ব্যাংক থেকে তিনি নিজের নামেই ৮২ হাজার কোটি টাকা নিয়েছেন। অথচ যে শেয়ারগুলো কিনে ৮২ শতাংশ মালিক হয়েছেন, সেগুলোর মূল্য ছিল মাত্র ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তিনি কইয়ের তেল দিয়ে শুধু কই ভাজেননি, কইও ভেজেছেন, শোল মাছও ভেজেছেন। সবই হয়েছে ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থের মাধ্যমে।”
‘চাপ দিয়ে শেয়ার হস্তান্তর করানো হয়েছে’
ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শেয়ারধারীদের ওপর বিশেষ সংস্থার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে শেয়ার হস্তান্তরে বাধ্য করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “একটি প্রতিষ্ঠানের নাম বলা হয়েছে, কিন্তু আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার একইভাবে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ওপর ভয়াবহ চাপ প্রয়োগ করে শেয়ার হস্তান্তর করানো হয়েছিল।”
জোরপূর্বক যাদের কাছ থেকে শেয়ার নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের কাছে আগের মূল্যে শেয়ার ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, এরপর আইন ও বিধি মেনে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হলে তাতে জামায়াতের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।
‘ইসলামী ব্যাংক কোনো দলের নয়’
ইসলামী ব্যাংককে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বিরোধিতা করে শফিকুর রহমান বলেন, এই ব্যাংকের গ্রাহক শুধু জামায়াতের সমর্থক নন; বিএনপি, অন্যান্য রাজনৈতিক দল, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী এবং সাধারণ মানুষও এর গ্রাহক।
তিনি বলেন, “ইসলামী ব্যাংক কোনো একটি দলের নয়। এটি দেশের মানুষের ব্যাংক। লাখো আমানতকারী ও কোটি কোটি টাকার লেনদেনের সঙ্গে এই ব্যাংক জড়িত।”
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দেশের বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “ইসলামী ব্যাংক কোনো কারণে যদি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে বসে যাবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন আশঙ্কাই করি।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাংকের আমানতকারীরা নিজেদের অর্থ ফেরত পেতে ভোগান্তিতে রয়েছেন। একই ধরনের সংকট যদি ইসলামী ব্যাংকেও তৈরি হয়, তাহলে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী এবং ভয়াবহ।
‘এস আলমকে ফেরানোর পথ তৈরি হচ্ছে’
বক্তব্যের এক পর্যায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময় ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, “ব্যাংকটাকে ধ্বংস করেছেন শেখ হাসিনা। এস আলমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এখন আমরা আশঙ্কা করছি, সেই এস আলমকে আবার ফিরে আসার পথ তৈরি করা হচ্ছে।”
তিনি ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর থাকাকালে এস আলম গ্রুপের নানা কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছিলেন। সেই কারণেই তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদে ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এদিন তীব্র বাক্যবিনিময় হয়। একদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অতীতের নিয়োগ, ঋণ বিতরণ ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তুলে তদন্তের পক্ষে অবস্থান নেন, অন্যদিকে জামায়াত আমির সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও শেয়ার কাঠামো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।








