সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন তহবিল বরাদ্দ নিয়ে যে বিতর্ক এখন সামনে এসেছে, তা নতুন নয়। বারবার ফিরে আসা এক প্রশ্নকেই আবার উসকে দিয়েছে: রাষ্ট্রের টাকা যায় কি নাগরিকের প্রয়োজন মেটাতে, নাকি ক্ষমতায় থাকা মানুষের রাজনৈতিক পছন্দ চরিতার্থ করতে?

আইনপ্রণেতাদের হিসাব বলছে, ৫০ জন নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩৭ জন বরাদ্দ পেয়েছেন, ১৩ জন পাননি। সমালোচকেরা স্পষ্ট বলছেন, এই বিভাজনের পেছনে প্রকল্পের যোগ্যতা বা জনগুরুত্ব নয়, রাজনৈতিক আনুগত্য ও দর-কষাকষিই কাজ করেছে। যদি তা সত্যি হয়, তবে এটি শুধু প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির লঙ্ঘন।

বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯ রাষ্ট্রকে বাধ্য করে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে। অনুচ্ছেদ ২৭ ঘোষণা করে, আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। অনুচ্ছেদ ১ গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি বলে। আর অনুচ্ছেদ ৬৫ মনে করিয়ে দেয়, সংসদ সদস্য—সরাসরি নির্বাচিত হন বা সংরক্ষিত আসন থেকে—সবাই জনগণের প্রতিনিধি, দলের কর্মী নন।

যখন উন্নয়ন তহবিলের দরজা রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে খোলে, তখন এই সাংবিধানিক কাঠামোর ওপরই আঘাত পড়ে।

সংসদীয় গণতন্ত্রে এমপির কাজ আইন প্রণয়ন ও জনস্বার্থ পাহারা দেওয়া। কিন্তু বরাদ্দ যদি আনুগত্যের পুরস্কার হয়ে দাঁড়ায়, তবে প্রতিনিধিত্বের ধারণাটাই ফাঁপা হয়ে যায়। প্রশ্নটা তাই কেবল ১৩ জন নারী এমপি বঞ্চিত হলেন কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের দাপট কি সংবিধানের সমতার অঙ্গীকারকে ফাঁকা বুলি বানাচ্ছে।

নাগরিক যখন দেখেন বরাদ্দ মেলে দলীয় আনুগত্যের বিনিময়ে, তখন তাদের মনে জন্মায় এক সহজ সিদ্ধান্ত: রাষ্ট্রীয় সম্পদ অধিকার নয়, আনুগত্যের সুবিধা। এ ধারণা গণতন্ত্রের ভিত নড়িয়ে দেয়।

গণতন্ত্রের পরিপক্বতা বোঝা যায় নির্বাচনের সংখ্যা দিয়ে নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা নিরপেক্ষভাবে কাজ করে তা দিয়ে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনেও ছিল আরও ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের দাবি। অথচ উন্নয়ন তহবিল বণ্টনের ধাঁচ যদি পুরোনো পক্ষপাতের পুনরাবৃত্তি হয়, তবে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফাঁক আরও চওড়া হবে।

উন্নয়ন তহবিল রাজনৈতিক পুরস্কার নয়। এটি জননীতির হাতিয়ার। এর বৈধতা নির্ভর করে জনগণের আস্থার ওপর, এই বিশ্বাসে যে এটি ন্যায্য ও সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে। অনুচ্ছেদ ২১ বলে, সংবিধান ও আইন মেনে চলা এবং জনস্বার্থে কর্তব্য পালন করা রাষ্ট্র ও নাগরিক—উভয়ের দায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদে প্রবেশাধিকার তাই রাজনৈতিক আনুগত্যের শর্তে বাঁধা পড়তে পারে না।

যদি উন্নয়ন রাজনৈতিক শর্তের অধীন হয়, তবে ক্ষতি শুধু বঞ্চিত এমপির নয়। ক্ষতি হয় প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার, গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের, আর অনুচ্ছেদ ২৭-এ প্রতিশ্রুত সাংবিধানিক সমতার।

জনগণের টাকা জনগণেরই। এর বণ্টন হতে হবে প্রয়োজন, ন্যায়বিচার ও সাংবিধানিক নীতির ভিত্তিতে—রাজনৈতিক রঙের ভিত্তিতে নয়। গণতান্ত্রিক নবায়নের অর্থ যদি কিছু থাকে, তবে তা শুরু হবে এই স্বীকারোক্তি দিয়ে যে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রীয় সুবিধার সমান অধিকারী। সেই স্বীকারোক্তি কাগজে নয়, বরাদ্দের তালিকায় প্রমাণ করতে হবে।