জুলাই বিপ্লবে পদ হারানো সেই খুরশিদ ইসলামি ব্যাংকের চেয়ারম্যান!
ব্যাংক পাড়ায় সমালোচনার ঝড়

জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের পদ ছাড়তে বাধ্য হওয়া মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এদিকে এ ঘটনায় ব্যাংকপাড়াজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ এই সিদ্ধান্তকে “ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসন” বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
রোববার চেয়ারম্যান জুবাইদুর রহমানের পদত্যাগের পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংক এ নিয়োগ দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো এক চিঠির মাধ্যমে ইসলামি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়। এরপর থেকেই আর্থিক খাতজুড়ে এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মো. খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চুক্তিভিত্তিক ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান। সে সময় তাকে তিন বছরের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একই বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তার সঙ্গে তাকেও পদত্যাগ করতে হয়।
ব্যাংক খাতের একাধিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক মনে করছেন, যে প্রেক্ষাপটে তাকে সরতে হয়েছিল, সেই বাস্তবতায় আবারও তাকে একটি বড় ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে বসানো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, “জুলাই আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল ফ্যাসিবাদী প্রভাবমুক্ত প্রশাসন ও আর্থিক খাত গড়ে তোলা। এখন যদি সেই সময়ের সুবিধাভোগী কর্মকর্তারাই আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসেন, তাহলে সংস্কারের বার্তা কোথায় থাকে?”
ইসলামি ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “ফ্যাসিবাদের দোসররা আবার ব্যাংকে পুনর্বাসিত হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য খুবই লজ্জার। শেখ হাসিনার আমলে তার আশীর্বাদপুষ্ট হয়েই তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছিলেন। এমনকি এস আলম গ্রুপের ব্যাংকিং সেক্টরে লুটপাটেও তার ভূমিকা ছিলো বলে ধারণা করা হয়৷ সেই ব্যক্তিকে এখন ইসলামি ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানানো হয়েছে।”
আরেকজন সাবেক ব্যাংকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ব্যাংকিং সেক্টরে এস আলম গ্রুপের প্রভাব বিস্তার, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধেও এস আলমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ ব্যাংক অঙ্গনে বহুদিনের আলোচনা।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাই-পরবর্তী সময়ে মানুষ আশা করেছিল ব্যাংকিং খাতে নতুন সংস্কৃতি আসবে। সেখানে বিতর্কিত আমলের লোকদের আবার বড় পদে বসানো হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে— আসলে কি কিছু বদলেছে?”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে খুরশীদ আলম প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেননি। এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকও এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
রোববার ইসলামি ব্যাংকের চেয়ারম্যান জুবাইদুর রহমান পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের কারণও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যেই নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এদিকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গঠিত বিএনপি সরকারের সময় থেকে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
একইসঙ্গে ব্যাংকের পুরোনো দখলদার ও অভিযুক্ত লুটপাটকারীরা যাতে পুনরায় ব্যাংকে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে দাবিতে গ্রাহকদের একটি অংশ ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। চলমান এ আন্দোলনের মুখে রোববার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা পরিচালনা পর্ষদের নির্ধারিত সভাও শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি মাসের ৩১ মে পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকা এমডি ওমর ফারুক খানের পদত্যাগের বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। তবে নিজের পদত্যাগের খবর নাকচ করেছেন ওমর ফারুক খান। সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি পদত্যাগ করি নাই।” এর বেশি কিছু না বলেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে বিভিন্ন অভিযোগের মধ্যে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব তলব করা হলে তিনি গত বছরের ১৭ জুলাই পদত্যাগ করেন। এরপর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমান।









